রাজশাহী-সিলেটের অনেক কেন্দ্রে অস্বাভাবিক ভোট





তিন সিটি

সদ্য সমাপ্ত তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্যে রাজশাহী ও সিলেটে অস্বাভাবিক ভোট পড়ার ঘটনা ঘটেছে। গত সোমবার (৩০ জুলাই) অনুষ্ঠিত রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৩৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ১২টিতে ৯০ শতাংশ ভোট পড়েছে। এছাড়া একই দিন অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি নির্বাচনে কোথাও ১৯ শতাংশ, কোথাও আবার ৯২ শতাংশের মতো ভোট পড়েছে। এছাড়া রাজশাহীতে একই ভোটকেন্দ্রে মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ভোট পড়ার ক্ষেত্রে ভিন্নতা পাওয়া গেছে।
রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের ঘোষিত ফল বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সব কেন্দ্রের বিস্তারিত ফল পাওয়া যায়নি।
নির্বাচনের ফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে গড়ে ৭৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ ভোট পড়েছে। অর্থাৎ তিন লাখ ১৮ হাজার ১৩৮ ভোটারের মধ্যে দুই লাখ ৫০ হাজার ৮৮১ জন ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে বৈধ ভোট দুই লাখ ৪৭ হাজার ১৯০টি, বাতিল ভোটের সংখ্যা ৩ হাজার ৬৯১টি।
অন্যদিকে সিলেট সিটিতে ভোট পড়েছে ৬১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এ সিটিতে তিন লাখ ২১ হাজার ৭৩২টি ভোটের মধ্যে বৈধ ভোট এক লাখ ৯১ ২৮৯টি ও বাতিল সাত হাজার ৩৬৭টি। এ সিটিতে প্রায় চার শতাংশ ভোট নষ্ট হয়েছে।
ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ১৩৮টি ভোটকেন্দ্রের অর্ধেকের বেশি কেন্দ্রে ৮০ শতাংশ বা তার বেশি ভোট পড়েছে। এর মধ্যে ১২টি ভোটকেন্দ্রে ৯০ শতাংশ বা তার বেশি ও ৫৮টিতে ৮০ শতাংশ বা তার বেশি ভোট পড়েছে। আর ৪৬টি কেন্দ্রে ৭০ শতাংশ বা তার বেশি ভোট পড়েছে। বাকি কেন্দ্রগুলোতে ৭০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে ভোট পড়েছে। এছাড়া অনেক কেন্দ্রে মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে একেক ধরনের ভোট পড়েছে।
দেখা গেছে, রাজশাহীর নগরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৯৭ দশমিক ২০ শতাংশ ভোট পড়েছে। এ কেন্দ্রে দুই হাজার ৫৭৬টি ভোটের মধ্যে দুই হাজার ৫০৪টি ভোট পড়েছে। বাকি ৭২টি ভোট পড়েনি। এ কেন্দ্রে নৌকায় এক হাজার ৬৩২টি ও ধানের শীষে ৮০৫টি ভোট পড়েছে। কাশিয়াডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৯১ দশমিক ৬৯ শতাংশ ভোট পড়েছে। এ কেন্দ্রে দুই হাজার ৫৮৬টি ভোটের মধ্যে দুই হাজার ৩৭১টি ভোট পড়েছে। এর মধ্যে নৌকা প্রতীকে এক হাজার ৫৭৫টি ও ধানের শীষ প্রতীকে ৬৬৭টি ভোট পড়েছে। এছাড়া গুড়িপাড়ার গোলজারবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৯০ দশমিক ৪৬ শতাংশ, গোলজারবাগ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৯৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ, ঠাকুরমারা কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৯১ দশমিক ১৭ শতাংশ ও সুপুরার রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট (২য় তলা) কেন্দ্রে ৯১ দশমিক ৩১ শতাংশ ভোট পড়েছে। এছাড়া শিরোইল কলোনির আলী নেওয়াজের অটো গ্যারেজের মাঠ কেন্দ্রে ৯১ দশমিক ১৯ শতাংশ, ছোট বনগ্রাম মাধ্যমিক আদর্শ বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৯০ দশমিক ৭০ শতাংশ, শাহমখদুম ডিগ্রি কলেজে ৯১ দশমিক ১১ শতাংশ, ভদ্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৯২ দশমিক ৭১ শতাংশ, সায়ের খাতুন নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৯১ দশমিক ৫৮ শতাংশ ভোট পড়েছে ও মীর আইউব আলী বিদ্যা নিকেতন কেন্দ্রে ৮৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ ভোট পড়েছে।
ফল পর্যালোচনা করে আরও দেখা গেছে, একই কেন্দ্রে মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ভোটের ভিন্নতা রয়েছে। রাজশাহীর ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাশিয়াডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মেয়র পদে দুই হাজার ৩৭১টি ভোট পড়েছে। এই কেন্দ্রেই সাধারণ কাউন্সিলর পদে দুই হাজার ২৭৭টি ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে দুই হাজার ৩৬৪টি ভোট পড়েছে। অর্থাৎ এই কেন্দ্রে মেয়রের তুলনায় সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৯৪টি ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে সাতটি ভোট কম পড়েছে। একইভাবে রাজশাহীর ২ নম্বর ওয়ার্ডে রাজশাহী কোর্ট কলেজ কেন্দ্রে মেয়র পদে দুই হাজার ৩১২টি, সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে দুই হাজার ২৫টি ও সাধারণ কাউন্সিলর পদে দুই হাজার ১০২টি ভোট পড়েছে। এ কেন্দ্রে মেয়র পদের তুলনায় সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ২৮৭টি ও সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২১০টি কম ভোট পড়েছে। ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউসেপ মোমেনা বখশ স্কুল কেন্দ্রে মেয়র পদে দুই হাজার ৫২৮টি, সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে দুই হাজার ৫০৬টি ও সাধারণ কাউন্সিলর পদে দুই হাজার ৫৫৩টি ভোট পড়েছে। আরও অনেক কেন্দ্রে একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে।
সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট পড়ার হারে অস্বাভাবিক তারতম্য দেখা গেছে। একটি কেন্দ্রে ৯১ দশমিক ৭১ শতাংশ ও আরেকটি কেন্দ্রে ১৯ শতাংশ ভোট পড়েছে। নির্বাচন কর্মকর্তারা এ দুটিকেই অস্বাভাবিক ভোটের হার বলে মনে করছেন। এ সিটি নির্বাচনে আরও দুটি ভোটকেন্দ্রে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট পড়েছে। সাতটি কেন্দ্রে ৮০ শতাংশ বা তার বেশি ও ২৬টি কেন্দ্রে ৭০ শতাংশ বা তার বেশি ভোট পড়েছে। অন্যদিকে অন্তত তিনটি ভোটকেন্দ্রে ৪০ শতাংশের কম ভোট পড়েছে। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, এ সিটিতে সোনারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সর্বোচ্চ ৯১ দশমিক ৭১ শতাংশ ভোট পড়েছে। এ কেন্দ্রে দুই হাজার ২৪৪টি ভোটের মধ্যে দুই হাজার ৫৮টি ভোট পড়েছে। অপরদিকে পুলিশ লাইন উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে সর্বনিম্ন ১৯ শতাংশ ভোট পড়েছে। এই কেন্দ্রে দুই হাজার ১৭১টির মধ্যে ৪২৯টি ভোট পড়েছে। এ কেন্দ্রেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী বেশি ভোট পেয়েছেন।
সিলেটের শেখঘাট এলাকার মঈনুন্নেসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৮৯ দশমিক ৯১ শতাংশ ভোট পড়েছে। অপরদিকে শাহ গাজী সৈয়দ বুরহানউদ্দিন রহ. মাদ্রাসা কেন্দ্রে ৮৯ দশমিক ৫০ শতাংশ ভোট পড়েছে।
রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশনেএমন ভোট পড়ার হারকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জালিয়াতির ঘটনা ঘটলে সেখানেই অস্বাভিক ভোট পড়াই স্বাভাবিক। এখন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে ৯০ শতাংশের বেশি ও ৩০ শতাংশের কম ভোট পড়া কেন্দ্রগুলোর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া।’
এর আগে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনটি ভোটকেন্দ্রে ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছিল। নির্বাচন কমিশনের একজন যুগ্ম-সচিবের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি ওইসব কেন্দ্রে অনুসন্ধান চালিয়েছিল। অনুসন্ধানে তিন কেন্দ্রেই অনিয়মের তথ্য পেয়েছিল কমিটি।