শহিদুল আলমের মুক্তির দাবিতে ৪০ শিক্ষকের বিবৃতি

হাসপাতাল থেকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার পথে শহিদুল আলম (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ জন শিক্ষক। বুধবার (৮ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই দাবি জানান তারা।

বিবৃতিতে শিক্ষকরা বলেন, গত একসপ্তাহে ‘প্রজন্ম ২০০০’ বলে যাদের অভিহিত করা যায়, তাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক সামাজিক আন্দোলন দেখলো বাংলাদেশ। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ হাতে লেখা সৃজনশীল প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন বহন করেছেন। সকাল-সন্ধ্যা আন্দোলনের গান গেয়ে গেছেন নিরলস। স্লোগান তুলেছেন ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’।  তারা আরও বলেন, আলোকচিত্রী ও অ্যাক্টিভিস্ট ড. শহিদুল আলম এই আন্দোলনের সবকিছুই ডকুমেন্টশন করছিলেন। তিনি একজন স্বাধীন সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শিক্ষার্থীদের ওপর চাপাতি হাতে সন্ত্রাসীদের হামলার চিত্র ভিডিও করছিলেন। 

শিক্ষকদের পাঠানো বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গত ৫ আগস্ট দুপুরের দিকে আল-জাজিরাকে একটি সাক্ষাৎকার দেন শহিদুল আলম। সেখানে ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করেন। সাক্ষাৎকার প্রচারের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর তাকে তার বাসভবন থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে তাকে কোথায় নেওয়া হয়েছে, তা জানা যাচ্ছিল না। ভবনের নিরাপত্তারক্ষীদের মতে, অনুপ্রবেশকারীরা নিজেদের ডিবির সদস্য পরিচয় দেন। তারা জোর করে সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজ নিয়ে যান ও সিসিটিভি ক্যামেরায় টেপ লাগান।

শহিদুল আলমকে বলপ্রয়োগ করে একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয় উল্লেখ করে বিবৃতে বলা হয়, বেশি রাতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন বার্তা সংস্থা ইউএনবিকে বলেছেন,  ছাত্র আন্দোলন নিয়ে ফেসবুক পোস্ট সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবির একটি দল শহিদুল আলমকে তার ধানমন্ডির বাসা থেকে আটক করেছে। বাকি রাত শহিদুল আলমের পরিবারের সদস্যরা ডিবি অফিসের বাইরে কাটান। ৬ আগস্ট সকালে পরিবারের সদস্যদের শহিদুল আলমের অবস্থান সম্পর্কে জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে তাকে আইসিটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।

শহিদুল আলমের স্ত্রী রেহনূমা আহমেদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে  বিবৃতিতে বলা হয়, রেহনূমা আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ‘‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি এভাবে কাউকে তুলে নিয়ে যেতে পারে? দুষ্কতিকারীরা পারে, আমরা সবাই জানি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি এভাবে মানুষকে তাদের ঘর থেকে অপহরণ করতে থাকে, তাহলে আমাদের ‘আইনশৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনী’ শব্দের অর্থ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।’’ বিবৃতিতে বলা হয়, রেহনূমা আহমেদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে চাই, শহিদুল আলমকে যে প্রক্রিয়ায় অপহরণ করা হয়েছে, তা নিন্দনীয়। তাকে অপহরণের দৃশ্যটি দেশে নাগরিকের অধিকার ও আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা অবিলম্বে শহিদুল আলমের মুক্তি চাই। তাকে আটক অবস্থায় অত্যাচার করা হয়েছে এবং তার চিকিৎসা সেবা প্রয়োজন। তাকে সাত দিনের রিমান্ড নেওয়া হয়েছে। যারা সম্পত্তি ধ্বংস করা, হুমকি প্রদান ও আইনানুগভাবে চলতে ব্যর্থতার জন্য দায়ী, সেই বাহিনীর কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড বিষয়ে তদন্ত করতে হবে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে করা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে কেন নিপীড়ন করা হলো? পুলিশের সহযোগিতায় পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেন বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হলেন? ২২ জন শিক্ষার্থীকে কেন দুই দিনের রিমান্ড দেওয়া হলো?’

বিবৃদিততে আরও বলা হয়, শহরের কোথাও কোথাও দলীয় সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন বাসায় লুকিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর নানা আক্রমণ চালাচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। বিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে বহিষ্কারের হুমকি দিচ্ছে। এসব কিছুর আমরা জবাব চাই। আইনি ব্যবস্থা নিতে চাই। শিক্ষার্থীদের সুরে সুর মিলিয়ে বলতে চাই। আমরা ন্যায়বিচার চাই।’

গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করেছেন, তারা হলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক আ-আল মামুন; নৃবিজ্ঞানবিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞানবিভাগের অধ্যাপক আইনুন নাহার;   অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ; ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীনা সিদ্দিকী;  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েল নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ফাহিমা আল ফারাবী; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক; অধ্যাপক  গীতি আরা নাসরিন;  উন্নয়ন অধ্যায়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম;  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানবিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহমুদুল সুমন; প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাসুদ ইমরান মান্নু;  নৃবিজ্ঞান বিভাগের  অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান; অ্যাকাউন্টিং ও ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা; জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়েল সহযোগী অধ্যাপক পারভিন জলি; জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক (ছুটিতে) কাজী অর্ক রহমান;  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রায়হান রাইন; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা;  জাহাঙ্গীরনগর নৃবিজ্ঞানি বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস; সহযোগী অধ্যাপক সায়েমা খাতুন; নৃবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক শাশ্বতী মজুমদার; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপারসন ও অধ্যাপক কাবেরী গায়েন;  অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অতনু রব্বানী;  মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আশিক মুহাম্মদ শিমুল;  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালযেল ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্ত্তী; গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক কাজী মামুন হায়দার; নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাহমিনা খানম;  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মানস চৌধুরী;  ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সিউতি সবুর; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক খাদিজা মিতু;  ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) ভিজিটিং ফ্যাকাল্টির শিক্ষক আজফার আহমেদ;  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মেহের নিগার; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনাসির কামাল; গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সাদাফ নূর-ই-ইসলাম; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুমাইয়া সরকার; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক সায়েমা খাতুন; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহাযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব ও নৃবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক জোবায়দা নাসরীন।