তবে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, ‘সংসদ ভবন এলাকায় এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পাশাপাশি এটি লুই আই কানের নকশাবহির্ভূত এবং এতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের গৌরব ও সৌন্দর্যে হানি ঘটবে। এছাড়া সংসদ সদস্যরা গাড়ি রেখে হেঁটে এই আন্ডারপাস ব্যবহার করবেন কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।’
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখানে দু’টি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের সব প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছিল। তখন আমরা বলেছি, কোন কোন সংসদ সদস্য হেঁটে এই ওভারব্রিজ ব্যবহার করবেন তার নিশ্চয়তা দেন। তখন কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। এছাড়া ফুটওভার ব্রিজ সংসদের মূল নকশার ব্যত্যয় ঘটাবে। পরে সেটা বন্ধ করা হয়। এখন যাদের কথা ভেবে আবার এই আন্ডারপাস নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তারা (এমপি) তো কেউ সেগুলো ব্যবহার করবেন না। কোনও এমপি গাড়ি রেখে আন্ডারপাস দিয়ে হেঁটে সংসদে যাবেন না। তারা গাড়ি নিয়েই আগের মতো রাস্তা ক্রসিং করে সংসদে যাবেন। কারণ আন্ডারপাসে গাড়ি ব্যবহার হবে কিনা তা আমি জানি না। তাছাড়া এটি সংসদ ভবনের সৌন্দর্য নষ্ট করবে।’
এই পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘যদি নির্মাণ করতে হয় তখন আন্ডারপাসের ভেতরে যাতে পানি প্রবেশ না করে সেজন্য আন্ডারপাসে প্রবেশ এবং বাইরের স্থানে দু’টি ঘর নির্মাণ করতে হবে। ঘর নির্মাণ করলে সেটা সংসদ ভবনের সৌন্দর্য নষ্ট করবে। এটি হবে লুই আই কানের নকশার পরিপন্থী। এই বিষয়গুলো নিয়ে আদালতেরও একটি আদেশ রয়েছে। এখানে কোনও স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। সংসদ ভবন হেরিটেজ ঘোষণা করতে হবে। তাহলে কীভাবে আন্ডারপাস করার চিন্তাভাবনা আসে? হ্যাঁ করা যায়। সেটা করতে হবে দুই পাশে কোনও ঘর নির্মাণ ছাড়া। কেউ ন্যাম ভবন থেকে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। তাহলে আন্ডারপাসের যথার্থতা আসবে।’ বলেন এই বিশেষজ্ঞ।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ‘ এ বিষয়ে গত ৮ আগস্ট সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জিএফআরডি শাখা থেকে সিনিয়র সহকারী প্রধান মাহবুব-এ-এলাহী স্বাক্ষরিত একটি নোটিশ আসে, যাতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে রবিবার (১২ আগস্ট) একটি সভা আহ্বান করা হয়েছে। এতে স্থানীয় সরকার বিভাগ, রেলপথ মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, জাতীয় সংসদ সচিবালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদফতর, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, স্থাপত্য অধিদফতর, বাংলাদেশ রেলওয়ে, ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ), সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ (উন্নয়ন/আরবান ট্রান্সপোর্ট), ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের (সওজ অংশ) প্রতিনিধিদের অংশ নেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই বৈঠকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পাশাপাশি বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য আরও একটি আন্ডারপাস নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা হবে।
জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কুদরত উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১০ সালের দিকে এখানে দু’টি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে। কিন্তু লুই আই কানের নকশা ও সংসদ ভবনের সৌন্দর্যের বিষয়টি চিন্তা করে সে প্রকল্প থেকে বেরিয়ে আসা হয়। সম্পতি সংসদ সচিবালয় আন্ডারপাস নির্মাণের জন্য আবার একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে। তবে এটা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। রবিবার (১২ আগস্ট) এ বিষয়ে একটি বৈঠক হবে।’
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের একজন ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সংসদ সচিবালয় থেকে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার জন্য অনুরোধ জানানো হলেও তা নিয়ে আমাদের শঙ্কা রয়েছে। কারণ এখানে আন্ডারপাস নির্মাণ করতে হলে প্রবেশের দুই পথে দু’টি উঁচু ঘর নির্মাণ করতে হবে। এতে রাস্তা থেকে সংসদ ভবন দেখতে সমস্যা হবে। সৌন্দর্য নষ্ট হবে। সংসদ ভবনের নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে। পাশাপাশি সংসদের মূল নকশার ব্যত্যয় ঘটার অভিযোগ উঠবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর দু’টি প্রবেশ মুখে বৃষ্টিরোধক ঘর নির্মাণ না করে পাম্পিং সিস্টেমের মাধ্যমেও করা যাবে। এভাবে করলে এই আন্ডারপাস লুই আই কানের নকশার একেবারে ব্যত্যয় ঘটবে বলে মনে হয় না। আর যদি যানবাহন পারাপার উপযোগী করে নির্মাণ করা হয় তাহলে সংসদ সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ী তা দেখতে হবে।’