আসছে গরু

ভারতীয় গরু (ফাইল ফটো)ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীতে বসা হাটগুলোতে এসেছে ভারতীয় গরু। ব্যবসায়ীদের চরম আপত্তি এবং সরকারের উৎসাহ না থাকলেও শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন পশুর হাটে ভারতীয় গরু উঠছে। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গরুর দাম কমতে শুরু করেছে বলে জানা গেছে। রাজধানীর আফতাবনগর, কমলাপুর, শনির আখড়া, কোনাপাড়া গরুর হাটে সোমবার (২০ আগস্ট) ভারতীয় গরু দেখা গেছে।
রাজধানীতে আসা কয়েকজন গরু ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপকালে তারা জানিয়েছেন, কোরবানি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পথে ভারত থেকে গরু আনা হচ্ছে। এর মধ্যে যশোরের পশ্চিমপ্রান্তজুড়ে ভারত সীমান্ত। এ সীমান্তের বেশিরভাগ জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে। তবে যেসব স্থানে বেড়া দেওয়া নাই, সেসব পথে পায়ে হেঁটে গরু বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। আর যেখানে কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে সেখানে নেওয়া হয় ভিন্ন কৌশল।
জানা গেছে, বৈধ পথে গরু, ছাগল ও ভেড়া আনার জন্য বেনাপোলে কয়েকটি পথের অনুমোদন দিয়েছে স্বরাষ্টমন্ত্রণালয়। পুটখালী, অগ্রভুলট, দৌলতপুর ও গোগা- এই চারটি পথ দিয়ে গরু আসছে ভারত থেকে। এছাড়া সিলেটের গোয়াইনঘাটের বিছনাকান্দি ও বেনাপোল সীমান্ত দিয়েও বাংলাদেশে প্রবেশ করছে গরু।
আফতারনগর গরুর হাটে কুষ্টিয়া থেকে আসা ব্যবসায়ী মোতালেব হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্থানীয় খামারের গরুসহ ভারতীয় কয়েকটি গরু বিক্রির জন্য ঢাকায় এনেছি। স্থানীয় গরুর সঙ্গে কয়েকটি ভারতীয় গরু থাকলে বিক্রির ক্ষেত্রে সুবিধা আছে। তাই মিলিয়ে এনেছি।’তিনি জানান, কুষ্টিয়া সীমান্তবর্তী জেলা। সরকারের লোকজনের অনুমতি নিয়েই সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু বাংলাদেশে আসছে।
এদিকে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট অফিসের একটি সূত্র জানায়, ভারত বৈধভাবে বাংলাদেশে গরু রফতানি করে না। তবুও প্রতি বছর ঈদুল আজহার আগে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অসংখ্য গরু আসে। গরু আমদানি বন্ধ করতে না পেরে গত বছর সিলেটের বিভিন্ন সীমান্তে করিডোর খোলা হয়েছিল।
তবে এ প্রসঙ্গে বিজিবির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন সীমান্তে করিডোর দিয়ে নির্ধারিত রাজস্ব দিয়েই বাংলাদেশে গরু আসছে। করিডোরের বাইরে কোনও সীমান্ত দিয়ে গরু আসছে না। সীমান্তে বিজিবির কড়া নজরদারি রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বৈধপথে সামান্য কিছু ভারতীয় গরু আসছে। এছাড়া বিপুল সংখ্যক দেশি গরুর সরবরাহ প্রমাণ করে যে, দেশি গরু দিয়েই আমাদের কোরবানির কাজ সম্পন্ন হবে।’অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ভারতীয় গরু আসার কারণে দেশি খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এমন তথ্য সঠিক নয়। কারণ বাংলাদেশে আসা ভারতীয় গরুর পরিমাণ খুবই কম।
ভারতীয় গরু (ফাইল ফটো)মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০১৮ সালে কোরবানির জন্য মোট প্রস্তুত করা পশুর পরিমাণ এক কোটি ১৫ লাখ ৮৮ হাজার। এর মধ্যে কোরবানিযোগ্য গরু ও মহিষের সংখ্যা ৪৪ লাখ ৫৭ হাজার। কোরবানিযোগ্য ছাগল ও ভেড়ার সংখ্যা ৭১ লাখ। এছাড়া কোরবানিযোগ্য উট ও দুম্বার সংখ্যা ৩১ হাজার।
২০১৭ সালে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল এক কোটি চার লাখ। এর মধ্যে কোরবানিযোগ্য গরু ও মহিষের সংখ্যা ছিল ৪৫ লাখ ২৯ হাজার। আর ছাগল ও ভেড়া ছিল ৫৮ লাখ ৯১ হাজার। এই হিসেবে দেখা যায়, ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে কোরবানিযোগ্য গরু ও মহিষের সংখ্যা কমলেও মোট পশুর সংখ্যা বেড়েছে ১১ লাখ ৮৮ হাজার।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৭২ হাজার গরু ও মহিষের সংখ্যা কমলেও বেড়েছে ছাগল ও ভেড়ার সংখ্যা, যার পরিমাণ ১২ লাখ ৯ হাজার। আর একদিন পর (২২ আগস্ট) কোরবানির ঈদ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বসেছে গবাদিপশুর হাট। নানারকম পশু কিনতে ভিড় করছেন ক্রেতারা। তবে ঈদের বাজারে কোরবানির পশুর কোনও সংকট হবে না- এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কেননা খামারিরা কোরবানির ঈদকে ঘিরে স্বপ্ন বুনছে। খামারিরা সেভাবেই প্রস্তুত করেছেন কোরবানির পশুকে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসেবে দেখা গেছে, সারা দেশের পাঁচ লাখের বেশি খামারি এবার জোগান দেবে কোরবানির পশু। এবার কোরবানির জন্য এক কোটি ১৫ লাখ গবাদিপশু প্রস্তুত আছে। তাই ভারত বা মিয়ানমারের গরুর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। পশুর জোগানে এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মতে, দেশে কোরবানির চাহিদা পূরণে পশুর জোগান দিতে বাইরের কোনও দেশের ওপর নির্ভর করতে হবে না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটের ব্যবসায়ী কোরবান আলী বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় গরু ও মহিষের সংখ্যা কমলে দেশে কোরবানির পশুর সংকট হতে পারে। বিশেষ করে গরু ও মহিষের। কারণ এখন দেশের বেশিরভাগ মানুষ গরু ও মহিষ কোরবানি দেয়। ছাগল ও ভেড়া কোরবানি কম হয়। তার ওপর ২০১৮ সালটা হচ্ছে নির্বাচনি বছর। তাই রাজনীতিবিদরা এবার বেশি করেই কোরবানি দেবেন এমনটাই মনে করা হচ্ছে। তাই গত বছরের তুলনায় এ বছর গরু ও মহিষের সংখ্যা কমলে আমাদের ভারত বা মিয়ানমারের গরুর ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
তবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশ এখন গবাদিপশু পালনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। অতীতের বেশ কয়েক বছরই কোরবানির জন্য আমদানি করা পশুর ওপর নির্ভর করতে হয়নি। দেশে উৎপাদিত পশু দিয়েই কোরবানি হয়েছে। এবারও হবে। দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নাই।’
জানা গেছে, গত বছর কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ৪ লাখ ৫৪ হাজার পশু (গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়াসহ)। গত এক বছরে উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে ১০ লাখেরও বেশি। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের একটি সূত্র জানায়, দেশে পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য খামারিরা গবাদিপশু পালনে উৎসাহিত হচ্ছে। এ অবস্থায় ভারত ও মিয়ানমার থেকে গরু আমদানির কোনও প্রয়োজন নেই। যদি ভারত ও মিয়ারমার থেকে গরু আমদানি করা হয় তাহলে আমাদের দেশের খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শাহ আলম বলেন, সারাদেশে ঈদুল আজহায় কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা এবার প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ। এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৪৪ লাখ ৫৭ হাজার এবং ছাগল-ভেড়ার সংখ্যা ৭১ লাখ। গত বছর এ সংখ্যা ছিল এক কোটি চার লাখ ২২ হাজারের কিছু বেশি। তবে এ বছর কোরবানিযোগ্য হৃষ্টপুষ্ট গরু-মহিষের সংখ্যা প্রায় ২৯ লাখ ২০ হাজার এবং ভেড়া ও ছাগল ১৮ লাখ ২৬ হাজার। বাকিগুলো অনুৎপাদনশীল গরু-মহিষ, ছাগল ও ভেড়া।