শুক্রবার বেলা সাড়ে ১২টায় ডিএনসিসির বর্জ্য ডাম্পিং করার একমাত্র জায়গা আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে গিয়ে দেখা যায়, তখনও নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে একের পর এক কোরবানি পশুর বর্জ্যবাহী গাড়ি আসছে। ল্যান্ডফিলের বর্জ্য মাপার কম্পিউটার রুমের সামনেও বর্জ্যবাহী যানবাহনের দীর্ঘ লাইন।
ল্যান্ডফিলের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় ডিএনসিসিকে বর্জ্যমুক্ত ঘোষণা করে প্যানেল মেয়রের সংবাদ সম্মেলনের সময় থেকে শুক্রবার বেলা ১টা ১০ মিনিট পর্যন্ত এই ল্যান্ডফিলে এক হাজার ৯৩৪ টন বর্জ্য অপসারণ হয়েছে। এরমধ্যে শুধু শুক্রবার এক হাজার ৫৮৫ টন বর্জ্য এসেছে। সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবার বেলা দেড়টা পর্যন্ত ডিএনসিসির ল্যান্ডফিলে ১০ হাজার ৪৩৪ মেট্রিক টন কোরবানি পশুর বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। বর্জ্য অপসারণের ঘোষিত ২৪ ঘণ্টার পর (শুক্রবার বেলা একটা ১০ মিনিট পর্যন্ত) ডিএনসিসির এই ল্যান্ডফিলে অতিরিক্ত আরও এক হাজার ৯৩৪ টন বর্জ্য পড়েছে। বেলা দেড়টার পরও আরও বর্জ্যবাহী ট্রাক লান্ডফিলে যেতে দেখা গেছে।
ল্যান্ডফিলে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধারণা, শুক্রবারও দিনের দ্বিতীয় ভাগে কোরবানি বর্জ্যবাহী ট্রাক ল্যান্ডফিলে যাবে।
এদিকে ঈদের তৃতীয় দিন শুক্রবার সকাল থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান সড়ক, অলিগলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাসাবাড়ির সামনে কোরবানি পশুর বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে। পড়ে থাকা বর্জ্য থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। পথচারীরা নাক চেপে চলাচল করছেন। এসব এলাকায় সংস্থার কোনও পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে কাজ করতে দেখা যায়নি।
সরেজমিন উত্তর সিটি করপোরেশনের গাবতলী ব্রিজ সংলগ্ন প্রধান সড়ক, গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের সামনে, কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন প্রধান সড়ক, কল্যাণপুর দারুসসালাম টাওয়ার সংলগ্ন ফুরফুরা দরবার শরীফের উল্টো পাশের প্রধান সড়ক, শ্যামলীর শিশুমেলার আগের প্রধান সড়কে, কলেজ গেটের শের শাহ রোড, জাপান গার্ডের সিটির সামনে ও মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডসহ বাসস্ট্যাডের আশপাশেসহ বিভিন্ন এলাকায় বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে। বেলা বাড়ার পরও ডিএনসিসির বিভিন্ন সড়কে বর্জ্যবাহী খোলা গাড়ি চলাচল করতে দেখা গেছে।
বেলা ১টা ৩৫ মিনিটেও দারুসসালাম টাওয়ারের উল্টোপাশের প্রধান সড়কে দেখা গেছে কোরবানি পশুর বর্জ্য পড়ে রয়েছে। ১টা ৪০ মিনিটে শ্যামলী শিশুমেলার উত্তর পাশের প্রধান সড়কে বর্জ্য পড়ে রয়েছে। এ সময় জুমার নামাজ পড়ে মুসল্লিদের এই সড়কের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় নাক চেপে ধরতে দেখা যায়।
জানতে চাইলে স্থানীয় বাসিন্দা হাজী ইমাম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গতকাল দুপুরে দেখেছি আমাদের প্যানেল মেয়র সাহেব ডিএনসিসিকে বর্জ্যমুক্ত ঘোষণা করেছেন। আজ কোরবানির তৃতীয় দিনেও বিভিন্ন এলাকায় এভাবে পশুর বর্জ্য পড়ে আছে। গন্ধে হাঁটা যায় না। বমি আসে। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদেরও দেখা যাচ্ছে না। শুনেছি ঢাকায় নাকি ২১ হাজার কর্মী মাঠে নেমেছে। আমরাও তো এই শহরের নাগরিক। কিন্তু গত দুদিনে ২১ জন কর্মীও তো চোখে পড়েনি। মেয়র সাহেব অনুরোধ করেছেন একটা নির্ধারিত স্থানে ময়লা রাখার জন্য। ঈদের দিন বাসার সামনের খোলা জায়গায় যেভাবে ময়লা রেখেছি, এখনও ঠিক সেভাবে ময়লা পড়ে আছে। তাহলে এমন ঘোষণা অর্থ কী দাঁড়ালো!’
এদিকে ডিএনসিসিসির বর্জ্যবাহী গাড়ির একাধিক চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুপুরে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, আজ সকাল থেকে উত্তরা এলাকায় বৃষ্টি হয়েছে। ফলে অনেক পরিচ্ছন্নতাকর্মী বর্জ্য সংগ্রহ করতে পারেনি। এ কারণে ওই এলাকার বিভিন্ন সড়কে এখনও বর্জ্য পড়ে আছে। আমরা এখনও বর্জ্য আনছি। শেষ করতে পারছি না।
তারা জানান, তখনও মিরপুর মাজার রোড, মিরপুর ১০, ১২, শেওড়াপাড়া, রোকেয়া সরণি, কালশী, উত্তরার বিভিন্ন সড়ক ও ৩০০ ফুটের বিভিন্ন স্থানে কোরবানি পশুর বর্জ্য পড়ে থাকার খবর পাওয়া গেছে।
এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করেও প্যানেল মেয়র মো. জামাল মোস্তফাকে পাওয়া যায়নি। তবে সংস্থার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাকির হোসেন বাবুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঈদের প্রথম দিনের কোনও বর্জ্য রাস্তায় নেই। গতকাল এবং আজ যারা কোরবানি দিয়েছে তার বর্জ্য থাকতে পারে। এরপরও যেসব স্থানে বর্জ্য রয়েছে, আমি জানিয়ে দিচ্ছি যাতে দ্রুত সেগুলো অপসারণ করা হয়।’
তবে তার বক্তব্য অনুযায়ী গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে আজ শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত এক হাজার ৯৩৪ টন বর্জ্য ঈদের দ্বিতীয় দিনের কোরবানির বর্জ্য হওয়ার কথা। তাই যদি হয়, তাহলে প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যে সাড়ে আট হাজার টন বর্জ্য উৎপাদন হয়েছে তার পাঁচ ভাগের একাংশের সমান দ্বিতীয় দিনের বর্জ্য। কিন্তু ডিএনসিসির পাঁচ শতাংশ মানুষ ঈদের দ্বিতীয় দিন পশু জবাই করেন না। এমন দাবি সংশ্লিষ্টদের।
ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিভিন্ন এলাকায় ডিএনসিসির পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও প্রাইমারি ওয়েস্ট সার্ভিস কালেকশন প্রোভাইডার বা ভ্যান সার্ভিসের কর্মীরা প্রথমে আমাদের নিজস্ব সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) ও কন্টেইনারে জমা করে। সেখান থেকেই বর্জ্যগুলো ল্যান্ডফিলে আনা হয়। কিন্তু এই কর্মীদের বর্জ্য আনতে দেরি হওয়ায় একটু সমস্যা হয়েছে।’
ছবি: সাজ্জাদ হোসেন