যা আছে প্রস্তাবিত শ্রম আইনে

প্রস্তাবিত শ্রম আইনশিশুশ্রম বন্ধ ও ৯০ দিনের মধ্যে শ্রমিকের অভিযোগ নিষ্পত্তির বিধান রেখে শ্রম আইন সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। একইসঙ্গে   শ্রমিকদের উৎসবভাতা, ১০ ঘণ্টার বেশি কর্মঘণ্টা না রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে এই আইনে। এছাড়া শ্রমিকদের জন্য গ্রুপ বীমা না করে সেন্ট্রাল ফান্ড গঠন করতে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের কল্যাণের যাবতীয় উদ্যোগ সেন্ট্রাল ফান্ড থেকে মেটানো হবে।

প্রস্তাবিত আইনের ১০৪ ধারায় বলা হয়েছে, যেকোনও শ্রমিক চাইলে অনুমতি সাপেক্ষে নির্ধারিত সাপ্তাহিক ছুটি নির্দিষ্ট দিনে ভোগ না করে যেকোনও উৎসবের ছুটির সঙ্গে ভোগ করতে পারবেন। কোনও মালিক শ্রমিককে উৎসবের দিন কাজ করাতে পারবেন, তবে একদিনের কাজের বিনিময়ে শ্রমিককে দুই দিনের পারিশ্রমিক ও পরবর্তী সময়ে একদিনের ছুটি দিতে হবে।      

সংশোধিত আইনের খসড়ায় ট্রেড ইউনিয়ন করার জন্য ন্যূনতম সদস্যের সম্মতি ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একইসঙ্গে ট্রেড ইউনিয়ন অনুমোদন দেওয়ার সময়সীমা কমানোর কথা বলা হয়েছে। ধর্মঘট ডাকার অধিকার দুই-তৃতীয়াংশ থেকে কমিয়ে ৫১ শতাংশ করা হচ্ছে।

প্রচলিত আইনে দুর্ঘটনায় মৃত্যুজনিত কারণে শ্রমিকের উত্তরাধিকারীরা একলাখ টাকা এবং স্থায়ী সম্পূর্ণ অক্ষমতার জন্য একলাখ ২৫ হাজার টাকা পাওয়ার বিধান রয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংশোধনী আইনের খসড়ায় করা প্রস্তাব করেছে, মৃত্যুর কারণে ক্ষতিপূরণ দুই লাখ টাকা এবং স্থায়ী সম্পূর্ণ অক্ষমতার ক্ষতিপূরণ দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা।

প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সুপারিশ অনুযায়ী আবারও শ্রম আইন সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।  ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন ২০১৮’ নামের এই আইনটি সোমবার (০৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত বর্তমান সরকারের ১৯৫তম মন্ত্রিপরিষদ সভায় এ প্রস্তাবিত আইনটির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা শেষে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক চুন্নু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদন ছাড়া আইন মন্ত্রণালয়ের পক্ষে ভেটিং করা সম্ভব নয়। তাই এবার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হলো, হয়তো মন্ত্রিপরিষদের আগামী সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন শেষে তা পাস করার জন্য সংসদে পাঠানো হবে। সেপ্টেম্বরের ৯ তারিখ ১০ম জাতীয় সংসদের ২২তম অধিবেশনে উপস্থাপন করা হবে। সংসদের এই অধিবেশনটি চলতে পারে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত। কাজেই সব-প্রক্রিয়া শেষে এই অধিবেশনেই প্রস্তাবিত সংশোধনী  আইনটি পাস হতে পারে।  

প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালের পর দ্বিতীয়বার এ আইনটিতে সংশোধন আনা হয়েছিল ২০১৩ সালে। ওইবার এ আইনের ৯০টি ধারায় সংশোধনী আনা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন মান্ত্রিপরিষদ সচিব মোহম্মদ শফিউল আলম। তিনি জানিয়েছেন, ‘এবার এ আইনটির ৪১টি ধারায় সংশোধনী আনা হয়েছে।’ 

শফিউল আলম বলেন, ‘শ্রম আইনে ধারা হচ্ছে ৩৫৪টি। এই সংশোধনী প্রস্তাবে দুটি ধারা, চারটি উপধারা, আটটি দফা সংযোজন করা হয়েছে। ৬টি উপধারা বিলুপ্ত করা হয়েছে। ৪১টি ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।’

জানা গেছে, বর্তমান আইনে বেআইনি ধর্মঘট বা লক আউটে অংশগ্রহণ করার জন্য এক বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। ঢিমেতালে কাজ করার জন্য ও অরেজিস্ট্রিকৃত ট্রেড ইউনিয়নসংক্রান্ত কাজেরও একই শাস্তির বিধান রয়েছে। এই শাস্তি কমিয়ে ছয় মাসের কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে সংশোধিত খসড়া আইনে। শিল্পের সার্বিক দিক বিবেচনা করে কারাদণ্ডের সময় কমিয়ে অর্থদণ্ড বহাল রাখার প্রস্তাব করেছে।

কোনও শ্রমিক একই সময়ে একাধিক ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য হলে বর্তমান শাস্তি ছয় মাস কারাদণ্ড, দুই হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ছয় মাসের স্থলে একমাসের কারাদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। সালিশের রায় না মানার শাস্তি ছয় মাসের কারাদণ্ড থেকে কমিয়ে তিন মাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনও মালিক নারী শ্রমিককে প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করলে ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান সংযোজন করা হয়েছে।

অসৎ শ্রম আচরণের দণ্ড কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে খসড়ায়। প্রচলিত আইনে দুই বছরের কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড ও উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। খসড়া আইনে দুই বছরের জায়গায় একবছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

খসড়া আইনে শ্রম পরিচালকের জায়গায় অংশগ্রহণকারী কমিটির মাধ্যমে শ্রমিক প্রতিনিধি মনোনয়নের বিধান রাখা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবিত আইনে যে প্রতিষ্ঠানে সিবিএ (শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন) নেই, সেখানে অংশগ্রহণকারী কমিটির শ্রমিক প্রতিনিধি মনোনীত হওয়ার সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমান আইনে ধর্মঘট বা লকআউটের ক্ষেত্রে গোপন ভোটের মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের অভিমত নেওয়ার বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে আইএলও ও দেশি শ্রমিক সংগঠনের আপত্তি রয়েছে। খসড়া সংশোধনীতে ধর্মঘটের বিষয়টি দুই-তৃতীয়াংশ থেকে ৫১ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমান আইনে মালিকপক্ষকে শ্রমিকপক্ষ তাদের দাবি মানতে বাধ্য করার জন্য ভীতি দেখানো, চাপ প্রয়োগ, বেদখল, হামলা বা টেলিফোন সুবিধা বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। নতুন আইন থেকে এসব শব্দ বাদ দেওয়া হয়েছে। নিষিদ্ধের তালিকায় পানি, বিদ্যুৎ বা গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়গুলো সংযোজন করা হয়েছে।

খসড়া আইনে অসৎ শ্রম আচরণ তদন্ত করার জন্য মানসম্পন্ন পরিচালন পদ্ধতি চালুর বিধান নতুন করে যোগ করা হয়েছে। গঠনতন্ত্রের মৌলিক বিধান লঙ্ঘন করলে, সদস্যসংখ্যা ৩০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে, প্রতারণার মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করলে রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার বিধান বিলুপ্ত করার জন্য আইএলও মত দিয়েছে। কিন্তু এই সংক্রান্ত ত্রিপক্ষীয় কমিটি শুধু গঠনতন্ত্রের কোনও মৌলিক বিধান লঙ্ঘন করলে রেজিস্ট্রেশন বাতিলের যে বিধান ছিল, তা বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছে।

কোনও ট্রেড ইউনিয়নের আবেদন পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে তা রেজিস্ট্রি করার বিধান রয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার সময়সীমা পাঁচ দিন কমিয়ে ৫৫ দিন করাসহ একটি এসওপি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশোধিত আইনে ২০ শতাংশ সদস্যের সমন্বয়ে ট্রেড ইউনিয়ন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিচয়পত্রের জটিলতা দূর করার জন্য অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের পরিচয়পত্রের দরকার হবে না—এমন বিধান রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে পাহারাদার, টহলদারি, নিরাপত্তা স্টাফ, গোপন সহকারীদের ট্রেড ইউনিয়নের আওতায় আনা হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনে মৃত শ্রমিকের পরিশোধিত অর্থ পরিশোধের জন্য তার মনোনীত ব্যক্তিকে খুঁজে না পাওয়া গেলে তা শ্রম আদালতে জমা দিতে হবে। শ্রম আদালত উত্তরাধিকারী খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলে এই অর্থ বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনকে দেবে। তারা উত্তরাধিকারীকে ১০ বছরের মধ্যে খুঁজে না পেলে সেই অর্থ তাদের নিজস্ব তহবিলে ফেরত পাঠানোর বিধান রাখা হয়েছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ২০০৬ সালের শ্রম আইন কার্যকর রয়েছে। বিভিন্ন শ্রম সংস্থা ও শ্রমিক সংগঠনের দাবির মুখে ২০১৩ সালে শ্রম আইন সংশোধন করা হলেও তা যথেষ্ট হয়নি বলে আলোচনা ছিল। এরপর থেকেই আইএলও, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), আন্তর্জাতিক ক্রেতা জোট ও বিভিন্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন শ্রম আইন ফের সংশোধনের দাবি তোলে। এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকার দেশে-বিদেশে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে। এরপর শ্রম আইন সংশোধনের খসড়া করে তা আইএলওতে পাঠানো হয়। আইএলওর পর্যবেক্ষণ আমলে নিয়ে মালিক, শ্রমিক ও সরকারি প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় কমিটি আইনটির খসড়া চূড়ান্ত করে।