রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিমের জন্ম তারিখ ছিল ৯/১১। তিনি একটি রেন্ট-এ-কার অফিসে গেলেন। সেখানে কোনও গাড়ি ছিল না। রিসিপশনিস্ট তাকে বললেন, ‘আগামীকাল একটি গাড়ি পাওয়া যেতে পারে। আপনার তথ্য দিয়ে যান।’
রাষ্ট্রদূত তার ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার পর জন্ম তারিখ দেখে রিসিপশনিস্ট বলে ওঠে, ‘আরে এটি তো ৯/১১।’ বুদ্ধিমান রাষ্ট্রদূত জবাব দিলেন, ‘দেখো বন্ধু, আমার বাবা-মা ৯/১১-এর পরিকল্পনা করেনি।’ পরদিন তিনি একটি গাড়ি ভাড়া করে ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা দিলেন।
ইতোমধ্যে তিনি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনেক নির্দেশনা দিলেন, যা তখনকার উপ-মিশন প্রধান মোস্তফা কামাল এবং অন্যান্য কর্মকর্তা ঠিকমতো পালন করেছিলেন। বাংলাদেশ প্রথম কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি, যারা এই ভয়ানক সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল।
তারিক এ করিম বলেন, ‘আমি জানতাম স্টেটমেন্ট ইস্যু করতে ঢাকা থেকে অনুমতি নিতে গেলে কয়েকদিন সময় লাগবে। এজন্য আমি সময় নষ্ট করিনি। মোস্তফাকে বললাম, রাষ্ট্রদূত, দূতাবাস এবং বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে ওইদিনই যেন একটি স্টেটমেন্ট ইস্যু করা হয়। একটি নোট ভার্বালের মাধ্যমে যেন এটি স্টেট ডিপার্টমেন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।’
দূতাবাসের পক্ষ থেকে স্টেটমেন্ট ইস্যু করার বিষয়টি ঢাকাকে জানিয়ে দিতে এবং তাদেরও স্টেটমেন্ট ইস্যু করার তাগিদ দিতে কর্মকর্তাদের প্রতি নির্দেশ দেন রাষ্ট্রদূত করিম। তিনি বলেন, ‘তিন বা চারদিন পর কংগ্রেসে প্রেসিডেন্ট বুশ একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। সেখানে সব দেশের রাষ্ট্রদূতদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমি যখন সেখানে পৌঁছালাম, তখন আমাকে অনেক সম্মান দেওয়া হয়েছিল। কারণ, বাংলাদেশ প্রথম দিকেই নিন্দা জানিয়েছিল। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে—তখনও ঢাকা থেকে স্টেটমেন্ট ইস্যু করা হয়নি।’
পরে সেই সময়ের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা শফি সামি আমাকে বলেছেন, স্টেটমেন্ট ইস্যু করার জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রধানের অনুমতি পেতে দেরি হওয়ার কারণে বিষয়টি বিলম্বিত হয়েছে। সেই সময়ে দুই নেত্রী ১ অক্টোবরের নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।
৯ সেপ্টেম্বরের আগে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সঙ্গে বৈঠকের জন্য আটলান্টা যান বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম। ১ অক্টোবর নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে কার্টারের ঢাকা আসার কথা ছিল। তাকে দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাতে তিনি আটলান্টা গিয়েছিলেন।
সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘‘সন্ত্রাসী হামলার দিন সকালে আটলান্টা চেম্বারের সঙ্গে আমার ব্রেকফাস্ট মিটিং ছিল। বৈঠক শেষ করে সকাল ৯টার দিকে ট্যাক্সিতে যখন আমি ফেরত যাচ্ছি, তখন ট্যাক্সি ড্রাইভার বিড়বিড় করে বলছে, ‘দুনিয়াতে কী শুরু হয়েছে! একটি প্লেন কীভাবে একটি বিল্ডিং এ ঢুকে পড়ে...।’ আমি তখন মনোযোগ দেইনি। হোটেল রুমে যখন ফিরলাম স্ত্রী বলছে, ‘টিভি দেখো। আর প্রেসিডেন্ট কার্টারের সঙ্গে তোমার দেখা হবে কিনা খোঁজ নাও।’ আমি সঙ্গে সঙ্গে টিভি খুলে সন্ত্রাসী হামলা সম্পর্কে জানতে পারি। আমার প্রতিক্রিয়া ছিল ওয়াশিংটনে মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা। কিন্তু তখন এত বেশি কল হচ্ছিল যে নেটওয়ার্ক ঠিকমতো কাজ করছিল না। অনেক চেষ্টার পরে মোস্তফার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলাম এবং তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলাম।’’
তিনি বলেন, ‘‘এরমধ্যে আমি কার্টার ফাউন্ডেশনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সেখান থেকে কেউ উত্তর দিচ্ছিল না। সিদ্ধান্ত নিলাম কার্টার ফাউন্ডেশনে যাওয়ার এবং আমার স্ত্রীসহ সেখানে গেলাম। কারণ, সেখানে মিসেস কার্টারের থাকার কথা ছিল। পৌঁছানোর পর আমাকে একজন কর্মকর্তা অভ্যর্থনা জানালেন এবং আশ্বস্ত করলেন কার্টারের সঙ্গে বৈঠক হবে। কিন্তু মিসেস কার্টারকে প্রশাসনের পরামর্শ অনুযায়ী একটি নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট কার্টারের জন্য যখন আমি অপেক্ষা করছিলাম সেই সময় প্রেসিডেন্ট বুশ ভাষণ দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, ‘পৃথিবীর যেখানেই থাকুক আমরা সন্ত্রাসীদের শিকারের মতো খুঁজে বের করবো।’ সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পেরেছিলাম এর ধারাবাহিকতা দীর্ঘদিন ধরে থাকবে এবং একটি মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।’’
ওয়াশিংটন
মিশন উপ-প্রধান মোস্তফা কামাল ৯টা ৫ মিনিটে অফিসে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে কমার্শিয়াল কাউন্সিলর গোলাম হোসেন তাকে বললেন, ‘স্যার, তাড়াতাড়ি আমার রুমে আসেন।’ হোসেনের রুমে টিভিতে তিনি প্রথম এই সন্ত্রাসী ঘটনার সংবাদ দেখেন।
মোস্তফার প্রথম কাজটি ছিল রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করা। তিনি বলেন, রাষ্ট্রদূত প্রথমেই আমাকে বলেছিলেন, ঢাকায় খবরটি জানাও এবং কেউ হতাহত হয়েছে কিনা খোঁজ নাও। হতবাক পরিস্থিতির মধ্যে আমরা আমাদের অবস্থান সংহত করার চেষ্টা করছিলাম।’
কূটনীতিক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘দূতাবাসের কয়েকজন স্টাফ যারা একযোগে অফিসে আসতো তারা পেন্টাগনে যে প্লেনটি বিধ্বস্ত হয়, সেই দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিল। দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে যারা রয়েছে এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের খোঁজ নেওয়া হলো। একইসঙ্গে নিউ ইয়র্ক কনস্যুলেট এবং জাতিসংঘ স্থায়ী অফিসেও খোঁজ নেওয়া হয়। সবাই হতবিহ্বল ছিল এবং পরিস্থিতি এত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল যে খাপ খাইয়ে নিতে বেগ পেতে হচ্ছিল।’
সেই সময়ে ওয়াশিংটনে শহীদুল ইসলাম ও মোহাম্মাদ নাজমুল কাউনাইন কাউন্সিলর, কাজি মেসবাহউদ্দিন আহমেদ অর্থনৈতিক মিনিস্টার, আবুল কালাম আজাদ প্রেস মিনিস্টার এবং প্রথম সচিবের পদে চৌধুরী এ নূর কর্মরত ছিলেন।
প্রথম থেকেই বোঝা যাচ্ছিল এ ঘটনার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং অনেক নতুন ধরনের ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে। সেই সময়ে অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি ক্রিস্টিনা রোকা এবং অন্যরা স্টেট ডিপার্টমেন্টে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি, বললেন রাষ্ট্রদূত।
নিউইয়র্ক
নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মুনশি ফায়েজ আহমেদ সকাল বেলায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার থেকে কয়েক ব্লক দূরে একটি বৈঠকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হঠাৎ তার স্ত্রী বলে উঠলেন, ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আগুন লেগেছে।’ মুনশি ফায়েজ আহমেদ বলেন, ‘আমি সঙ্গে সঙ্গে টিভিতে দেখলাম দ্বিতীয় প্লেনটির আক্রমণের দৃশ্য। বৈঠকে না গিয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করলাম।’
তিনি বলেন, ‘৬৬তম স্ট্রিটের গোড়ায় সব গাড়ি আটকে দিলো পুলিশ। বাধ্য হয়ে আমি তখন হাঁটতে থাকলাম। কিছু দূর যাওয়ার পর সেটিও ব্লক করে দেয় পুলিশ। আমি তখন আমার অফিসে ফেরত আসলাম। তখন আমরা দুজন অফিসার কাজ করতাম।’
মুনশি ফায়েজ আহমেদ বলেন, ‘অফিসে ফেরত গিয়ে বাঙালি কমিউনিটি যারা ছিল তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলাম এবং জানার চেষ্টা করলাম কেউ হতাহত হয়েছে কিনা। প্রথমদিকে গুজব আসতে লাগলো অনেক বাঙালি মারা গেছে। কারণ, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের একদম ওপরে একটি রেস্টুরেন্ট আছে, যেখানে অনেক বাঙালি কাজ করতো। এছাড়া, অনেকে সেখানকার বিভিন্ন অফিসে কাজ করতো। কিন্তু আমরা মোটামুটি জানতে পারলাম ছয়জন নিখোঁজ। কয়েকদিন পরে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হলো—ছয়জন বাংলাদেশি ওই সন্ত্রাসী হামলায় মারা গেছে। আমরা কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে সবার বাসায় গিয়েছি এবং তাদের পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’
তিনি বলেন, ‘ঘটনার কয়েক দিন পর একজন নারী এসে বললেন, তার স্বামী নিখোঁজ রয়েছেন। ওই নারীর সন্দেহ তার স্বামী ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে মারা গেছেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানালাম। কিন্তু পরে জানা গেছে, ওই সন্দেহ সঠিক ছিল না। সেই সময়ে আমরা বাঙালি কমিউনিটির সঙ্গে অনেক বৈঠক করেছি এবং বলেছি তাদের এখন কী করা উচিত। আমরা প্রধানত তাদের তিনটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করতাম—প্রথমত, সন্ত্রাসবাদকে নিন্দা জানাও। দ্বিতীয়ত, আমেরিকায় আমেরিকান হওয়ার চেষ্টা করো এবং তৃতীয়ত, বাংলাদেশের রাজনীতি যেন যুক্তরাষ্ট্রে চর্চা করা না হয়। সেই সময়ে বিদ্বেষমূলক অপরাধও বেড়ে গিয়েছিল এবং পরবর্তীতে একজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছিলেন।