রাস্তায় শ্রমিকদের সীমাহীন বাড়াবাড়ি

রেহাই পায়নি অ্যাম্বুলেন্সও ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ সংশোধনসহ ৮ দফা দাবিতে রাস্তায় নৈরাজ্য কায়েম করেছে পরিবহন শ্রমিকরা। রবিবার (২৮ অক্টোবর) সকাল থেকে তারা রাস্তায় বাস, ট্রাক, লরি, লেগুনাসহ গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। একইসঙ্গে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যারিকেড দিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছেন শ্রমিকরা। তাদের বাধার মুখে পড়েছে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেট কার, সিএনজি ও মোটরসাইকেল। বাদ যায়নি সংবাদ সংগ্রহের কাজে থাকা সাংবাদিকদের গাড়ি ও মটরসাইকেলও। রাস্তায় যারাই কোনও না কোনও গাড়ি চালিয়েছে, তাদেরকেই বাধা দেওয়া হচ্ছে। গাড়ির ভেতরে কে বা কারা আছে— তাও চেক করেছে শ্রমিকরা। আর এটা করতে গিয়ে তারা সীমাহীন বাড়াবাড়ি করে।

পাইভেট কারের চালক ও আরোহীসহ মোটরসাইকেল চালকদের মুখে পোড়া মোবিল মাখিয়ে দিয়েছে। মোটরসাইকেল আরোহীর হেলমেট ভেঙে ফেলেছে। জোর করে ছিনিয়ে নিয়েছে গাড়ির চাবি। অনেক স্থানে এলোপাতারি ট্রাক রেখে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেছে। সিএনজি অটোরিকশা থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দিতেও দেখা গেছে। এক কথায় রবিবার সকালে জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নামা নগরবাসীকে জিম্মি করে পরিবহন শ্রমিকরা।

রাজধানীর জিরোপয়েন্ট, রায়েরবাগ, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, টিকাটুলি, গুলিস্তানসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মানুষের সীমাহীন ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে। এসব এলাকায় হাজার হাজার মানুষকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। অনেকে পায়ে হেঁটেই গন্তব্যে রওনা দেন। কেউ কেউ কয়েকগুণ বেশি ভাড়া গুনে ভ্যানগাড়ি, পিকআপ ভ্যান, রিকশা, মোটরসাইকেলে করে গন্তব্যে পৌঁছাতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হন। নির্বিচারে চালক ও যাত্রীদের চোখে-মুখে ও পোশাকে পোড়া মোবিল মেখে দিয়েছে শ্রমিকরা।

যাত্রাবাড়ী থেকে চিটাগাং রোড, ডেমরা রোড, নারায়ণগঞ্জ রোডে সকাল থেকে এ দৃশ্য দেখা যায়। এসব এলাকায় পুলিশকে বিচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। তারা কোনও অ্যাকশনে ছিল না। পুলিশ শ্রমিকদের বাধা দিচ্ছে না কেন, জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে  কয়েকজন পুলিশ সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে জানান— অর্ডার নাই। ওপরের নির্দেশের অপেক্ষায় আছি। 

প্রসঙ্গত, জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ও রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর হওয়া ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ সংশোধনসহ ৮ দফা দাবিতে রবিবার সকাল থেকে সারাদেশে শুরু হয়েছে অঘোষিত ৪৮ ঘণ্টার কর্মবিরতি। এই কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা রাস্তায় রীতিমত নৈরাজ্য সৃষ্টি করে চলেছে। শ্রমিকরা এই আন্দোলনের পক্ষে জনমত আদায়ে মাইকিং ও র‌্যালিও করেছে।

মোটরসাইকেল চালককে নাজেহাল করছে শ্রমিকরাসরেজমিনে দেখা গেছে, কুতুবখালী হয়ে চিটাগাং রোডের দিকে যেতে, কিংবা গুলিস্তান যেতে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের রাস্তায় পরিবহন শ্রমিকরা সিএনজি অটোরিকশা, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকার চলাচলে বাধা দেয়। এমনকি তারা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীতে আসা রোগী পরিবহনকারী অ্যাম্বুলেন্স চলাচলেও বাধা দিয়েছে। শনির আখড়া এলাকায় দেখা গেছে, মোটরসাইকেলের এক চালকের হেলমেট খুলে রাস্তায় আছাড় মেড়ে ভেঙে ফেলেছে। এসময় তাদের অনেকের হাতে ছিল পোড়া মোবিল। প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও সিএনজি অটোরিকশার চালকদের শরীরে সেই মোবিল লাগিয়ে দিচ্ছে পরিবহন শ্রমিকরা।

পরিবহন শ্রমিকদের ডাকা এই ধর্মঘটে রাজধানীসহ সারাদেশে সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। সায়েদাবাদ, গাবতলী, গুলিস্তান ও মহাখালী বাস টার্মিনাল ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন স্থানে ধর্মঘটের সমর্থনে পরিবহন শ্রমিকদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ চোখে পড়েছে সবারই। তারা দলবদ্ধ হয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়।

অফিসে যাবার সময় রায়েরবাগ, সানার পাড়, চিটাগাং রোড মোড়ে বাংলা ট্রিবিউন, যুগান্তর, আমাদের সময় পত্রিকার সাংবাদিকদের মোটরসাইকেল আটকে দেয় একদল পরিবহন শ্রমিক। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরও তারা অনেকের সঙ্গেই উশৃঙ্খল আচরণ করে এবং শরীরে পোড়া মোবিল লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

শ্রমিকদের আন্দোলন সম্পর্কে জানতে চাইলে সরকারের নৌ পরিবহনমন্ত্রী ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান জানান, এ ধর্মঘট সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। সকালে সচিবালয়ের নিজ দফতর থেকে জাতীয় সংসদে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি কিছু জানি না। এ নিয়ে আমি কোনো কথা বলবো না।’

এ সম্পর্কে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘যারা আন্দোলন করছে, তারা আইন না পড়েই আন্দোলন করছে।’ তিনি পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের আইনটি পড়ে দেখারও অনুরোধ জানিয়েছেন। সকালে নারী ও শিশু অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে যোগদান করা বিচারকদের ওরিয়েনটেশন কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে এসব কথা বলেন তিনি।

একইভাবে দুপুরে সচিবালয়ে সাধারণ বিমা কর্তৃপক্ষের দেওয়া ডিভিডেন্ডের চেক গ্রহণ শেষে আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, কোনও ধরনের নৈরাজ্য সহ্য করা হবে না। সরকার সব ধরনের নৈরাজ্য কঠোর হাতে দমন করবে।