নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে ‘নেপাল-চীন মৈত্রী ফোরামে’র আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো একটি আন্তর্জাতিক আলোচনা সভা, যেখানে চুলচেরা বিশ্লেষণ হলো বিআরআইতে দক্ষিণ এশিয়ার কী লাভ-ক্ষতি তা নিয়ে। ওই সেমিনারে ছিলেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরাও, আর সেখানেই কিছুটা আভাস মিললো এ নিয়ে ঢাকার ভাবনা-চিন্তার।
বিআরআই নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় দেশ ভারতের মূল আপত্তি কাশ্মির ইস্যুতে। পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দর থেকে যে অর্থনৈতিক করিডোর চীন অবধি প্রসারিত হচ্ছে, সেটা বিআরআইয়ের একটা মূল শাখা, আর তা যাচ্ছে পাকিস্তান শাসিত কাশ্মিরের বুক চিরে। ওই ভূখণ্ডকে ভারত নিজেদের বলে দাবি করে। কাজেই দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সেই বিআরআইকে মেনে নেওয়া ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়।
অথচ ভারতের পূর্ব সীমান্তে যে বিসিআইএম (বাংলাদেশ-চায়না-ইন্ডিয়া-মিয়ানমার) করিডোর স্থাপন নিয়ে বহুদিন ধরে কথাবার্তা চলছে, ভারত তার রূপায়ণে আগ্রহী সানন্দেই। এই প্রস্তাবিত করিডোরের গুরুত্বপূর্ণ শরিক বাংলাদেশও। আর এটা যদি টেকনিক্যালি বিআরআইয়ের অংশ না হয়, তাতে যোগদান করতেও ভারত অসুবিধার কিছু দেখে না।
‘এই পটভূমিতে বাংলাদেশ কিন্তু ভারত ও চীনের মধ্যে একটা স্ট্র্যাটেজিক ভারসাম্য বজায় রেখেই চলতে চাইবে। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকার বহুদিন ধরেই এই দুই শক্তির মধ্যে চমৎকার একটা ব্যালান্স বজায় রেখে চলেছে—আর বিআরআইয়ের ক্ষেত্রেও তার কোনও ব্যতিক্রম হবে না বলেই আমার বিশ্বাস’, বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান, যিনি সদ্য ফিরেছেন কাঠমান্ডুর ওই আলোচনা সভা থেকে।
কিন্তু বিআরআই নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে নতুন আরেকটা দুশ্চিন্তাও দেখা দিয়েছে—আর সেটা আর্থিক।
‘প্রথমে অন্য দেশগুলো ভেবেছিল এটা হবে চীনের তরফ থেকে একটা ‘ফ্রি লাঞ্চ’—মানে যাবতীয় খরচ সব বেইজিংই জোগাবে, আর তার বদলে তারা পেয়ে যাবে সলিড অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক করিডোর। কিন্তু এখন এটা স্পষ্ট যে চীন এর জন্য সহজ শর্তে ঋণ দেবে, তার বেশি কিছু নয়!’ বলছিলেন দিল্লির থিংক ট্যাংক রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম ফর ডেভেলপিং কান্ট্রিজের (রিস) অধ্যাপক ড. প্রবীর দে।
ড. দে বহু বছর ধরে চীন ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার কানেক্টিভিটি নিয়ে কাজ করছেন, কাঠমান্ডুর সেমিনারেও তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান প্যানেলিস্ট।
তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু চীনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে হামবানটোটা বন্দর ও এয়ারপোর্ট বানিয়ে শ্রীলঙ্কা যেভাবে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে, তা অনেককেই দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। এমনকি মালয়েশিয়ার মতো দেশ কিংবা বেল্ট-রোডের একদা চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানকে পর্যন্ত চীনের ঋণ নিয়ে নতুন করে যেভাবে ভাবতে হচ্ছে—আমি নিশ্চিত বাংলাদেশকেও সেই ফ্যাক্টরটা মাথায় রাখতে হবে।’
বাংলাদেশকে অবশ্য বছর দুয়েক আগেই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঢাকায় এসে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের ‘ব্ল্যাংক চেক’ লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই চেকের পুরোটা যে অনুদান নয়, বরং অনেকটাই ঋণ, তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে।
অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, ‘আমি কিন্তু বলবো, ভারত নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ক্ষেত্রে যে ধরনের সংবেদনশীলতা বা সেন্সিটিভিটি আছে, চীনকে নিয়ে তা একেবারেই নেই। তারপরও শেখ হাসিনা সরকার দুই শক্তির মধ্যে থেকে পরিষ্কার একটাকে বেছে নিয়ে সেদিকে কখনও ঝুঁকে পড়েননি। যেমন ধরুন, বাংলাদেশে পায়রা বন্দর নির্মাণের যে কাজ চলছে, সেখানে একটা বিরাট আমব্রেলা প্রজেক্টের নিচে ভারত ও চীনের কোম্পানিগুলো একসঙ্গে কাজ করছে, যা অন্য কোথাও হয়তো ভাবাই যায় না!’
‘অথবা বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে নৌবাহিনীর সাবমেরিন যেমন কিনেছে, তেমনি ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সমঝোতাও করেছে। চীন হয়তো ডিপ সি পোর্টের বরাদ্দ পায়নি, কিন্তু ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সর্বোচ্চ বিডার হিসেবে ভারতকে টপকে ২৫% মালিকানা পেয়েছে চীনা কনসোর্টিয়াম। ফলে আমার বিশ্বাস, বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ নিয়েও বাংলাদেশ একটা মাঝামাঝি রাস্তা ঠিকই বের করতে পারবে!’
অনেকটা একই মত ঢাকার এশিয়ান টাইগার ক্যাপিটালের গ্রুপ চেয়ারম্যান ইফতি ইসলামেরও।
দক্ষিণ এশিয়াতে বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভের প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু, তা নিয়ে কাঠমান্ডুর সভায় বক্তব্য রেখেছেন মি. ইসলামও। তিনি কিন্তু মনে করেন, ‘আজকের তারিখে বিআরআই নিয়ে ভারতের যতই আপত্তি থাকুক, ভবিষ্যতে এই প্রকল্পে ভারতের এনগেজমেন্ট কিন্তু একেবারেই অসম্ভব নয়। আর সেক্ষেত্রে তাতে বাংলাদেশের যোগদানও অবশ্যই অনেক সহজ ও মসৃণ হবে।’
‘সত্যি কথা বলতে কী, সার্ক-ই বলি বা বিমস্টেক, দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে কোনও আঞ্চলিক জোটই এখনও তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। সেখানে ২০৫০ সালের মধ্যে যেখানে চীন বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে এবং ভারত হয়তো থাকবে তৃতীয় স্থানে, সেখানে ওই দুই দেশের প্রতিবেশে (নেইবারহুড) থাকা বাংলাদেশ তাদের কাউকেই এড়িয়ে চলতে পারে না’- বলছিলেন ইফতি ইসলাম।
এ পরিস্থিতিতে সম্ভবত সবচেয়ে সহজ সমাধান হতে পারে চীন যদি বিসিআইএম করিডোরকে কাগজে-কলমে বিআরআইয়ের বাইরে রাখে, এমনটা মনে করেন অধ্যাপক প্রবীর দে।
‘মজার ব্যাপার হলো চীন এখনও সরকারিভাবে বিআরআইয়ের কোনও মানচিত্রই প্রকাশ করেনি। যে ম্যাপগুলো ইন্টারনেট বা বাজারে ঘুরছে, সেগুলো ওই দেশের বিভিন্ন থিংক ট্যাংকের তৈরি।’
‘কিন্তু সেগুলো নিয়ে কোনও প্রশ্ন তুললেই চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয় বলে—না না, ওগুলো আমাদের কিছু নয়। সেরকম কিছু না-কি চূড়ান্তই হয়নি। আসলে ঘুরপথে এই মানচিত্রগুলো প্রকাশ করে তারা বোধহয় আন্তর্জাতিক মনোভাবটা পরখ করতে চাইছে!’ বলছিলেন ড. দে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যথারীতি সতর্ক নজর রাখবে বিআরআই নিয়ে (কাশ্মিরর প্রশ্নে) ভারত তাদের আপত্তি শিথিল করে কিনা, কিংবা বিসিআইএম করিডোরের কাজ এই প্রকল্প থেকে পৃথক রাখা হয় কিনা! সম্ভবত তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা দ্রুত ও কতটা আগ্রহ নিয়ে যুক্ত হবে এই বেল্ট-রোডের উদ্যোগে!