প্রবাসী শ্রমিকদের মর্যাদা কতটুকু রক্ষা হচ্ছে

প্রবাসে বাংলাদেশি কর্মী

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি প্রবাসীদের কষ্টার্জিত আয় থেকে পাঠানো রেমিটেন্স। কিন্তু সেই প্রবাসীরা তাদের প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হন পদে পদে। বিদেশে যাওয়ার সময় কিংবা বিদেশ থেকে দেশে ফেরত আসার পথে বিভিন্নভাবে হেনস্থার শিকার হন তারা। প্রশ্ন হচ্ছে, অর্থনীতিতে অবদান রাখা এই অভিবাসীদের মর্যাদা কতটুকু রক্ষা পাচ্ছে? আজ  ১৮ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে দিনটিকে নানভাবে পালন করা হচ্ছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, অভিবাসীর অধিকার—মর্যাদা ও ন্যায় বিচার।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনশক্তি,কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমএইটি) তথ্য অনুযায়ী— ১৯৭৬ সাল থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশ থেকে এক কোটি বিশ লাখ মানুষ লোক বিদেশে গেছেন। এরমধ্যে ২০১৭ সালে  রেকর্ড সংখ্যক লোক বিদেশ গেছেন, যার পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ। ২০১৮ সালের ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদেশ গেছেন ৭ লাখ ১২ হাজার ৩৪২ জন কর্মী। বাংলাদেশি প্রবাসীরা প্রতি বছর গড়ে ১৪ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠাচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের কারণেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কয়েক বছর আগেই ৩০ বিলিয়ন বা তিন হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।

অর্থনীতিতে প্রবাসীদের বিশাল অবদান থাকলেও বিদেশের মাটিতে তাদের ন্যায্য মর্যাদা এবং সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়।  সবচেয়ে বেশি অভিযোগ হলো— বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা। এছাড়া, দেশে ফিরে আসার পর বিমানবন্দরেও হতে হয় নানাভাবে হেনস্থার শিকার।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সুত্রে জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বিমান বন্দর শুল্ক ও গোয়েন্দা বিভাগ, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সমন্বয়ে বহির্গমন ও দেশে ফেরার সময়ে প্রবাসী কর্মীদের সম্মানজনক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে রয়েছে— প্রবাসী কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার সময় আলাদা ইমিগ্রেশন বুথ, নারী কর্মীদের জন্য বিদেশ যাওয়া এবং ফেরত আসার সময় আলাদা ইমিগ্রেশন বুথের প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অফিস কক্ষ স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রস্তবনা পাঠানো, বিদেশ ফেরত কর্মীর দ্রুত লাগেজ প্রাপ্তি, লাগেজ চুরি প্রতিরোধ এবং কোনও ঝামেলা ছাড়াই নিজ লাগেজ নিয়ে বিমানবন্দর ত্যাগের ব্যবস্থা গ্রহণ, বিদেশ ফেরত কর্মীদের নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছানোর লক্ষ্যে প্রদত্ত সেবার মান বাড়ানোর জন্য বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ, জরুরি প্রয়োজনে বিদেশ ফেরত কর্মীর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে সহায়তা প্রদান করা, বিদেশগামী এবং বিদেশ থেকে ফেরত আসা কর্মীরা যাতে বিমানবন্দরে কোনও প্রকার হয়রানির শিকার না হয়, সেজন্য বিমানবন্দরের সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত ছবি কিংবা ভিডিও বিমানবন্দরের ভেতরে এবং বাইরে বিভিন্ন মনিটরে প্রদর্শনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ এবং বিদেশ থেকে আগত  ও বিদেশগামী কর্মীদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন নিশ্চিত করা।  

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব রৌনক জাহান সোমবার (১৭ ডিসেম্বর) মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘অভিবাসী কর্মীদের বহির্গমন ও প্রত্যাবর্তন সম্মানজনক ও সুষ্ঠু করার জন্য মন্ত্রণালয় আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ লক্ষ্যে বিমানবন্দরে ডেস্কগুলোতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কাজ করছে। বিমানবন্দরে কর্মীদের যেন কেউ অসম্মান বা টানা-হেঁচড়া অথবা হয়রানি না করতে পারে,এ লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নাধীন আছে।’

তিনি বলেন,  ‘প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স জাতীয় উন্নয়নের অগ্রগতিকে আরও  ত্বরান্বিত করছে। আপনারা জানেন সরকারের উদ্যোগ ও কর্মকাণ্ডে সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিবেচনায় নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। আমাদের এ সাফল্যে প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিটেন্সের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মন্ত্রণালয় সফলভাবে কাজ করছে। ক্রমান্বয়ে রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকে সঞ্চিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আমাদের অর্থনীতিকে দাঁড় করিয়েছে শক্ত ভিত্তির ওপরে।’

মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই যে এক কোটি লোক বিদেশে পাঠিয়ে কথায় কথায় বলি যে, তারা দেশের অর্থনীতি সচল রাখছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা মোটেও তাদের মর্যাদা দেই না। আমাদের কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার পথে ভোগান্তি, সেখানে যতদিন থাকে তখন ভোগান্তি, দূতাবাসে সাহায্যের জন্য গেলে সেখানে ভোগান্তি, ফেরার পর ভোগান্তি। প্রতি পদে পদে এদের অস্মমান, অবহেলা এটা একটি ভয়ঙ্কর সংকট। কারণ, আমরা আমাদের নাগরিকদের সম্মান দেই না বলেই সেদেশের মানুষজনও আমাদের কর্মীদের অসম্মান করে। এদেরকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিতে হবে। আমরা যদি এদেরকে মর্যাদা না দেই, অন্য  দেশও দেবে না। আমাদের অর্থনীতিতে যারা এত অবদান রাখছে, তাদের সম্মান দেওয়াটা জরুরি। মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।’