ভারত সরকারের একাধিক সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে আভাস দিয়েছে, এনআরসির প্রশ্নে বাংলাদেশ সরকার যে দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েছে, সেটাই নয়াদিল্লির এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভারতের এই সিদ্ধান্ত ঢাকাকে অনেকটাই নিশ্চিন্ত করবে। কারণ, এই এনআরসি ঘিরে দুদেশের মধ্যে গত কয়েক মাসে বেশ কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল।
আসামে ‘অবৈধ বিদেশি’ বলতে মূলত কথিত বাংলাদেশিদেরই বোঝানো হচ্ছিল এবং এনআরসি প্রক্রিয়া শেষ হলে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা হতে পারে বলেও একটা আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল।
কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার (১৮ ডিসেম্বর) ভারতের পার্লামেন্টে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লিখিতভাবে জানিয়ে দিয়েছে, ‘এনআরসি প্রক্রিয়াকে আসাম ছাড়া দেশের অন্য কোনও রাজ্যে সম্প্রসারিত করার কোনও পরিকল্পনাই এই মুহূর্তে নেই।’
ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হংসরাজ আহির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের এমপি প্রসূন ব্যানার্জির এক প্রশ্নের লিখিত জবাব দিতে গিয়ে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, আসামে এনআরসি প্রক্রিয়ার কাজ চলছে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে, সরকারি বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নয়। কিন্তু যেহেতু আসাম ছাড়া অন্য কোনও রাজ্যে এনআরসি বা অনুরূপ প্রক্রিয়া চালু করার ব্যাপারে শীর্ষ আদালত কিছু বলেননি, তাই সরকারও তা ভাবছে না।
কয়েক মাস আগে আসামে এনআরসির চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশের পর থেকেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে দাবি উঠেছিল, সেখানেও একই ধরনের তালিকা তৈরি করে অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করতে হবে। মূলত ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতাকর্মীরাই ছিলেন এই দাবির নেপথ্যে। তারা পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, কর্নাটকসহ বিভিন্ন রাজ্যে এনআরসি চালুর দাবি তুলতে থাকেন।
ইতোমধ্যে বিজেপির প্রভাবশালী নেতা রাম মাধব ঘোষণা করেছেন, এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ পড়বে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো (‘ডিপোর্ট’) করা হবে।
এসব ঘটনার জেরে ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে কিছুটা সন্দেহ ও অবিশ্বাসের ছায়াপাত ঘটে বলেই সংশ্লিষ্টরা বলেন। যদিও বাংলাদেশ প্রকাশ্যে এনআরসি-কে আগাগোড়াই ‘ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বর্ণনা করে এসেছে। তবে বিষয়টি নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথাও তারা ভারতের কাছে গোপন করেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।
সূত্রমতে, আসামের ‘অবৈধ বিদেশি’ বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করার চেষ্টা হলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। ঢাকা সে কথাও দিল্লির কাছে পরিষ্কার করে দিয়েছিল।
এই পটভূমিতেই বিজেপির রাজনৈতিক নেতৃত্বের আপত্তি সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকার সিদ্ধান্ত নেন, এনআরসি সংক্রান্ত বিতর্ক এখন আসামের বাইরে কোথাও টেনে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। অযথা এনআরসি নিয়ে দুদেশের সুসম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলাটাও সমীচীন হবে না বলে রায় দেন সরকারের একাধিক নীতি-নির্ধারক।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস এর ফলে বাংলাদেশের কাছে একটা ইতিবাচক সংকেত যাবে এবং তারা এনআরসি নিয়ে এখন অনেক বেশি আশ্বস্ত বোধ করবে।’
আরও পড়ুন: এনআরসি নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই