কর্মচাঞ্চল্য নেই সচিবালয়ে







সচিবালয়সরকারের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক দফতর বংলাদেশ সচিবালয় এখন অনেকটাই ফাঁকা। গত পাঁচ বছর সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের পদচারণায় মুখর ছিল সচিবালয়। ছিল দর্শনার্থী ও তদবিরকারীদের ভিড়। সব মিলিয়ে জমজমাট থাকতো পুরো সচিবালয়। এখন মন্ত্রীদের উপিস্থিতি নেই, নেই তদবির পার্টি ও দর্শনার্থীরাও। সচিবালয়ে ঢোকার পাস ইস্যু নিয়েও নেই তাই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দৌড়ঝাঁপ।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দর্শনার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় সচিবালয়ের ভেতরের হোটেল বাণিজ্যে ভাটা পড়েছে। দর্শনার্থী ঠেকাতে পুলিশকেও আর গলদঘর্ম হতে হচ্ছে না। আর এ সুযোগটি নিয়েছেন মূলত নিম্ন ও মধ্যম শ্রেণির কর্মকর্তারা। তারা এই ফাঁকে অফিসের বাইরে ব্যক্তিগত কাজ গুছিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ কিছু সময় গল্পগুজব করে দুপুরের আগেই বাসায় ফিরে যাচ্ছেন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য গত ২৮ নভেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন থেকে চলছে এই ঢিলেঢালা অবস্থা।
আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এতে অংশ নিচ্ছেন সরকারের চার টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী ছাড়া সবাই। ফলে রাজধানীসহ সারাদেশে নির্বাচনি প্রচারণায় ব্যস্ত তারা। চার টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীর পদত্যাগপত্র গৃহীত হওয়ায় তারাও আর সচিবালয়মুখী হচ্ছেন না। নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থা থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সচিবালয়ের ৩নং ভবনে অবস্থিত একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেহেতু মন্ত্রী মহোদয় নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিতে নিজ এলাকায় রয়েছেন, তাই তিনি দফতরে অনুপস্থিত। তবে জরুরি বা রুটিন কোনও কাজ থেমে নেই। আমরা করছি। আর মন্ত্রী মহোদয়ও টেলিফোনে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। কাজেই সমস্যা হচ্ছে না।’
তবে ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের এলাকায় যারা নির্বাচন করছেন তারা সচিবালয়ে গেলেও থাকছেন খুবই অল্প সময়। বৃহস্পতিবার (২০ ডিসেম্বর) সচিবালয় ঘুরে দেখা গেছে, কর্মদিবস হলেও প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয় ছিল একেবারেই ফাঁকা। কোথাও কোনও মিটিং নেই। নেই কর্মব্যস্ততা। মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি ছাড়াও কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা থাকায় সচিবালয়ে তদবিরকারীদের আগমন কমে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবারের নির্বাচনে অংশ গ্রহণ না করলেও তার ছোট ভাই মোমেন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন। অর্থমন্ত্রী ঢাকায় অবস্থান করলেও দফতরে অনিয়মিত। তবে তিনি সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর রাখছেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ নির্বাচন করছেন ভোলা-১ আসনে। তাই তিনি ভোলায় রয়েছেন বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবদুল লতিফ বকসী। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর কিছু সময়ের জন্য ঢাকায় এসে পুনরায় ফরিদপুরে ফিরে গেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ রয়েছেন সিলেটে। তিনি নির্বাচন করছেন সিলেট-৬ আসনে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। কুষ্টিয়ায় নিজ নির্বাচনি এলাকায় রয়েছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।
খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম নির্বাচন করছেন ঢাকা-২ আসনে। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মেহেদেী হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর থেকেই ব্যস্ত রয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী। তাই তিনি সচিবালয়ে আসছেন না। তবে খোঁজ-খবর রাখছেন নিয়মিত। ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ নিজ এলাকা পাবনায় রয়েছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহম্মদ নাসিম প্রচারণায় রয়েছেন সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে। তিনি নির্বাচন করছেন সিরাজগঞ্জ-১ আসনে। বন ও পরিবেশমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ নির্বাচন করছেন চট্টগ্রাম থেকে। তিনিও এলাকায় রয়েছেন। নিজ এলাকা পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় রয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি এবারের সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পিরোজপুর-২ আসন থেকে। দীর্ঘদিন ধরেই খুলনায় রয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। নওগাঁয় রয়েছেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী ইমাজউদ্দিন প্রামানিক। টাঙ্গাইলে রয়েছেন একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম। ঢাকার বাইরে থাকায় তারা কেউই দফতরে আসছেন না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা-১১ (তেজগাঁও) আসন থেকে নির্বাচন করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। নির্বাচনি কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি সচিবালয়ে নিজ দফতরে আসছেন। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নির্বাচন করছেন নোয়াখালী থেকে। তিনিও নির্বাচনি প্রচারণার পাশাপাশি নিজ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর কাজের অগ্রগতি দেখছেন সরেজমিনে।
জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব মোহম্মদ শফিউল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের স্বাভাবিক কাজকর্ম চলছে। মন্ত্রী মহোদয়গণ দফতরে নেই বলে সরকারের কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজ আটকে নেই। তারা আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন, তাই তারা নির্বাচনি প্রচারণায় নিজ নিজ এলাকায় রয়েছেন, যা খুবই স্বাভাবিক। তবে তারা সার্বক্ষণিক মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।’