শিক্ষকদের বিএড প্রশিক্ষণের মান নিয়ে প্রশ্ন

নায়েমএকজন শিক্ষক ব্যাচেলর অব এডুকেশন (বিএড) প্রশিক্ষণ নিয়ে শিক্ষকতা করার সনদ পেয়ে থাকলেও যা পড়ে তিনি এই সনদ পান তার মান নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। একের পর এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, আত্মহত্যার চেষ্টা বা কিশোরদের বিভিন্ন গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার পেছনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের অবনতি ও প্রকৃত শিক্ষার অভাবকে চিহ্নিত করছেন যারা তারা বলছেন, নামেমাত্র প্রশিক্ষণ হচ্ছে। সিলেবাসে নতুনত্ব নেই।

শিক্ষক, প্রশিক্ষক ও মনোবিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীর প্রতি আচরণ ও শিক্ষা প্রদানের ধরন প্রতিটা ক্লাসরুমে ভিন্ন ভিন্ন। ফলে শিক্ষকের প্রশিক্ষণের ধরনও বদলাতে হবে। তারা এও বলছেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক কাউকে শেখানো সম্ভব না তবে একটা দিকনির্দেশনা থাকতে পারে। বর্তমানে প্রচলিত বিএড প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেটি সঠিকভাবে সম্পাদন হচ্ছে না।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের কাজে যোগদানের তিন বছরের মধ্যে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ও বিএড কোর্স সম্পন্ন করার কথা। বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য সরাসরি প্রশিক্ষণ কলেজ রয়েছে, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম), মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, উচ্চমাধ্যমিক কলেজের শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের জন্য পাঁচটি এইচএসটিটিআই এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও গবেষণার জন্য একটি শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট রয়েছে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও দূরশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতিবছর বিএড ডিগ্রি প্রদান করা হয়।এছাড়া শতাধিক বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও শিক্ষকতা পেশা হিসেবে কেমন এবং এ যুগে শিক্ষার্থীর সঙ্গে  আচরণের ধরন কী হবে তার কোনও যুগোপযোগী দিকনির্দেশনা নেই।

ভিকারুন্নিসা নূন স্কুল ও কলেজের শিক্ষক সৈয়দা তানজিনা ইমাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রতিবছর নতুন নতুন ধারণা নিয়ে শিশুরা ক্লাসে আসে। ভুলে গেলে চলবে না তাদের সব ভাবনা, ধারণা ইউনিক হয়। কোনও সুনির্দিষ্ট ফর্মুলাতে তাদের ফেলা সম্ভব না এবং তাদের সমস্যাগুলো ছকে বেঁধে সমাধান দেওয়া সম্ভব না।

তিনি বলেন, একজন শিক্ষককে প্রত্যেক পরিস্থিতি ধারণ করার তাৎক্ষণিক সহজাত ক্ষমতা থাকতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, শিক্ষকতায় যখন এসেছেন তখন শিক্ষার্থীকে বুঝতে হবে। ক্লাসের চল্লিশ শিশু একভাবে হ্যাঁ-না বলবে না। এদিকে বিএড প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভৌত ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণের মান অনেক ক্ষেত্রে খুবই নিম্নমানের বলে অভিযোগ করেন কেউ কেউ। অভিযোগের বিষয়ে তানজিমা ইমাম বলেন, বিএড- এর ডে কারিকুলাম যুগোপযোগী করা সবার আগে জরুরি।

বিএড প্রশিক্ষণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক বিষয়ে পাঠ দেওয়া হয় কিনা প্রশ্নে সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষক কানিজ ‍সাঈদা বিনতে সাবাহ বলেন, শিক্ষার্থীর সঙ্গে আচরণ নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয় তবে আমরা সাবজেক্টে গুরুত্ব বেশি দেই। লাইফ স্কিলবেজড এডুকেশনের ট্রেনিং যারা নেয় তাদের সম্পর্ক বিষয়টা শতভাগ জানা আছে। তবে তিনি এও স্বীকার করে নেন, একজন শিক্ষকের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বুঝতে হবে আমাদের প্রশিক্ষণ কার্যকর হয়নি। একজন শিক্ষক বা একজন শিক্ষার্থী কেমন আচরণ করবে তার দুইদিকই তো দেখার আছে। বিএড ট্রেনিংয়ে থাকে এই বিষয়গুলো। চাইল্ড সাইকোলজি বুঝতে হলে এ প্রশিক্ষণ থাকতেই হবে। শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের আচরণ কেমন হবে জানতে হবে। বিএড- এর কোন অংশে সম্পর্ক ও আচরণ বিষয়ে পড়ানো হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিখন শিখানোর দক্ষতা ও কৌশল অংশে এটি শেখানো হয়। বিষয়টা অনেকটা হিডেন। প্রশিক্ষণরত শিক্ষককে সরাসরি জানানো হয় এমন না।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের অবশ্যই এ বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে কোন বয়সে কী ধরনের সাপোর্ট দিতে হবে তা শিক্ষকের জানতে হবে। বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীরা বেশি আগেবপ্রবণ থাকে। সে সময় হয়তো একটা পছন্দের ছোট জিনিস না পেয়েও আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এসব ঘটনা রোধে স্কুলে  গুরুত্ব দিয়ে তার সঙ্গে আচরণ করতে হবে। সে যেন তার বেঁচে থাকাটা কেন গুরুত্বপূর্ণ তা অনুভব করতে শেখে।