নির্বাচনে সহিংসতা রোধে ইসিকে শক্ত অবস্থানে থাকার আহ্বান

‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরানির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করতে সহনশীল রাজনীতির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও নির্বাচন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সহাবস্থানের মাধ্যমে অহিংস ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব। একইসঙ্গে সহিংসতা রোধে নির্বাচন কমিশনকেও শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে। ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বৃহস্পতিবার (২৭ ডিসেম্বর) রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে ‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তারা এসব কথা বলেন।

গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে ডেমোক্র্যাসি ইন্টারন্যাশনাল।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট এবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছার বলেন, স্বাধীনতার পর এবারের নির্বাচন সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও অংশগ্রহণমূলক। আমাদের ভালো দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে। আমাদের দল সরকারে থাকলেও আমাদের নেতাকর্মীরা নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন।’

এবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছার বলেন, ‘আমরাই তত্ত্ববধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করেছিলাম। কিন্তু এটি নিয়ে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমরা চাই না একদিনের জন্যও অনির্বাচিত কেউ সরকারের দায়িত্বে থাকুক।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা এ নির্বাচনে উদাহরণ সৃষ্ট করতে চাই। বিয়ে বাড়িতেও ছোটখাটো সমস্যা হয়। এখন জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে দেশ কীভাবে চলবে। আগামী প্রজন্ম সিদ্ধান্ত নেবে দেশ কেমন হবে।’

ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্স (ফেমা)-এর সভাপতি মুনিরা খান বলেন, ‘নির্বাচনের আর দুই দিন বাকি। এরমধ্যে যা হওয়ার, তা তো হয়েই গেছে। এখন নির্বাচনের দিন যেন শান্তিপূর্ণ হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু হতে হবে। প্রার্থীদের সতর্ক থাকতে হবে, যেন তাদের নেতাকর্মীরা সহিংসতায় জড়িয়ে না পড়েন। সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। সবকিছুতে নির্বাচন কমিশন অ্যাকাউন্ট্যাবল। যেন ইলেশকশনের দিন কোনও অঘটন না ঘটে।’ তিনি বলেন, ‘ভোটারদের ভয়-ভীতি দেখালে অনেকে ভোট দিতে আসবেন না। ভোটের পরেও যেন সহিংসতা না হয়, সব দলের পোলিং এজেন্ট যেন ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।’

সামাজিক সংস্থা ডি নেটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম সিরাজুল হোসেন বলেন, ‘সহিংসতা দূর করতে হলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ন্যায়বিচার না থাকলে শান্তি ফিরবে না। মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে সহিংসতা ছড়ানো হয়। মানুষের আবেগকে উসকে দেয় কারা? মানুষকে যেন কোনোভাবে উত্তেজিত না করতে পারে, সেদিকে নজর দিতে হবে। সবার সহ্য ক্ষমতা বাড়াতে হবে।’

ডেমোক্র্যাসি ইন্টারন্যাশনালের ইলেশকশন প্রোগ্রামের সিনিয়র পরিচালক আব্দুল আলীম বলেন, ‘নির্বাচনের সঙ্গে শান্তির একটি সম্পর্ক রয়েছে। আগে একটা সময় যুদ্ধ করে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতা দখল হতো। এটির পরিবর্তন হয়ে ইলেকশন এসেছে, যেটি সভ্য প্রক্রিয়া। ইলেকশনের সঙ্গে ভায়োলেন্স শব্দটি যায় না। তারপরও নির্বাচনে ভায়োলেন্স হয়। কোনও কোনও দেশে নির্বাচন অভিশাপ। বাংলাদেশে ২০০৮ সালের নির্বাচনকে বেস্ট ইলেশকশন বলা হয়, তারপরও সেই নির্বাচনে ভায়োলেন্স হয়েছিল।’

সহিংসতা রোধে নির্বাচন কমিশনের জোরালে পদক্ষেপ প্রয়োজন উল্লেখ করে আব্দুল আলীম বলেন, ‘নির্বাচনে সহিংসতা রোধে তিনটি মডেল রয়েছে। একটি হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের নিরাপত্তার জন্য পরিকল্পনা ও কাজ। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে, নির্বাচন কমিশন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেবে। আর শেষ পদ্ধতি হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে কাজ করবে। সহিংসতা রোধে নির্বাচন কমিশনকে শক্ত বার্তা দিতে হবে। কেউ ভায়োলেন্স করলে যেন ছাড় পাবে না, এমন বার্তা নির্বাচন কমিশন থেকে দেওয়া প্রয়োজন।’

দৈনিক সমকাল ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, ‘সহিংসতা রোধে সমাধানের পথ রাজনৈতিক দলগুলোকে খুঁজতে হবে। একটি কথা প্রচলিত আছে, ভোটের দিন জনগণ একদিনের বাদশা। এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশের সব নির্বাচনে সহিংসতা হয়েছে। সহিংসতা রোধে নির্বাচন কমিশনকে শক্ত মেজেস দিতে হবে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে না।’

ইনডিপেনডেন্ট টিভির বার্তা প্রধান আশিষ সৈকত বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। সব প্রার্থীর এজেন্টকে ভোটকেন্দ্রে পাঠাতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা থাকলেই সহিংসতা দূর করা সম্ভব।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসিম উদ্দিন হলের ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক হাসান আল আরিফ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ৩ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে, বিএনপির ৪৩ হাজার নেতাকর্মী আটক হয়েছেন। আমরা দুষ্টু আর অন্য পক্ষ ফেরেশতা, এ অবস্থা যদি হয়, তাহলে নির্বাচনের দরকার কী?’ তাত্ত্বিক বিষয়ে আলোচনা করে সমাধান হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।