এই মুহূর্তে বাংলাদেশ থেকে আগত অন্তত ২৮ জন প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসা চলছে ভারতের দুটি সেরা আর্মি হাসপাতালে। বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত এই মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার সব খরচই বহন করছে ভারত সরকার।
৪৭ চল্লিশ বছর আগে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতের সেনাবাহিনীর মিলিত শৌর্যের সামনে আত্মসমর্পণ করেছিল পাকিস্তানি হানাদাররা, সেই বিজয়ের মাসেই স্থাপিত হলো দুই দেশের মধ্যে এই বিরল মানবিকতার সেতু।
২০১৭ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন তার সর্বশেষ ভারত সফরে এসেছিলেন, তখন দিল্লিতে এক ‘সম্মাননা’ অনুষ্ঠানে তিনি একাত্তরের যুদ্ধে নিহত ভারতীয় সেনাদের পরিবার-পরিজনের হাতে স্বীকৃতির ফলক ও সহায়তা তুলে দেন। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও প্রতিশ্রুতি দেন, তার দেশও বাংলাদেশের ১০০ জন মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসার ভার বহন করবে।
সেই আশ্বাসের বাস্তবায়নেই গত সপ্তাহে বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছেন এই ২৮ জন প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা। তাদের প্রত্যেকেরই বয়স ৬০ থেকে ৭০ বছরের ভেতর, ফলে যুদ্ধের সময় তারা সবাই ছিলেন দুরন্ত কিশোর বা ডাকাবুকো যুবক!
কিন্তু আজ তারা অনেকেই স্ট্রোক বা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন, কেউ বা ভুগছেন ডায়াবেটিসে। কেউ বা প্রস্ট্রেটের সমস্যায় জর্জরিত, কারও আবার শরীর আংশিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ভারতে এখন সামরিক হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাদের চিকিৎসা করছেন।
গত সপ্তাহে ভারতে এসে পৌঁছনোর পর ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসা শুরু হয়েছে দিল্লির আর্মি হাসপাতালে। এই ব্যাচের বাকি ১৫ জনের চিকিৎসা চলছে দাক্ষিণাত্যে পুনের সামরিক হাসপাতালে।
২৫ ডিসেম্বর বড়দিনে বাংলাদেশি হাই কমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী দিল্লিতে চিকিৎসাধীন এই মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। দিল্লির আর্মি হাসপাতালে গিয়ে তিনি খোঁজখবর নেন— তারা সবাই কেমন আছেন বা তাদের চিকিৎসা কেমন চলছে!
ওই মুক্তিযোদ্ধারা সবাই তাকে জানিয়েছেন, ভারতের সামরিক বাহিনী তাদের যেভাবে চিকিৎসা করছে এবং আর্মি হাসপাতালে যেরকম যত্নে ও আতিথ্যে তাদের রাখা হয়েছে, তাতে তারা খুবই সন্তুষ্ট।
হাই কমিশনার আলীও তাদের বলেন, ‘আমি নিজেও একজন কূটনীতিক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে সামিল ছিলাম। ফলে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এখন আপনাদের মনের ভেতর কী ধরনের অনুভূতি হচ্ছে, সেটা বেশ অনুমান করতে পারছি।’
বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নানা বিভাগের সরকারি কর্মকর্তারাও ভারতের এই পদক্ষেপকে দারুণভাবে সাধুবাদ জানিয়েছেন। প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেরই হয়তো বিদেশে গিয়ে ব্যয়বহুল চিকিৎসা করানোর সাধ্য ছিল না, ভারত তাদের সেই প্রয়োজনটাই মেটাচ্ছে।
ভারত সরকারের কর্মকর্তারাও বলছেন, বিজয়ের মাসে এই পদক্ষেপ দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলেই দিল্লি বিশ্বাস করে। আগামী দিনে আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে ভারতে নিয়ে এসে চিকিৎসা করানো হবে বলেও তারা জানাচ্ছেন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত যখন গত মঙ্গলবার (২৫ ডিসেম্বর) দিল্লির আর্মি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, তখন তার সঙ্গে ছিলেন ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল কালাম মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান এবং বাংলাদেশ হাই কমিশনের হেড অব চ্যান্সেরি এএফএম জাহিদ-উল ইসলাম। তারাও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাদের সবার খোঁজখবর নেন।