প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে স্থায়ী ব্যবস্থার উদ্যোগ নেই

প্রশ্নফাঁসদেশের পাবলিক পরীক্ষায় অস্থায়ী ব্যবস্থায় সাময়িকভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ সম্ভব হয়েছে। তবে এই ব্যবস্থা পুরোপুরি ও স্থায়ীভাবে কার্যকর করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই প্রতিবারই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঝুঁকি নিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝুঁকিমুক্ত পরিস্থিতি তৈরি করতে দ্রুত বহুনির্বাচনি (এমসিকিউ) পরীক্ষা বাদ দিতে হবে। নতুবা প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু স্থায়ীভাবে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তেমন কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইন এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সমন্বিত প্রচেষ্টা ও নতুন কিছু পদক্ষেপ নিয়ে সাময়িকভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে আমরা সফল হয়েছি। তবে এটি স্থায়ী কোনও ব্যবস্থা নয়। তাছাড়া একেবারেই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় যে প্রশ্নপত্র ফাঁস কোনোভাবেই হবে না। তাই জরুরিভাবে স্থায়ী পদ্ধতির দিকে যাওয়া উচিত।’

স্থায়ী পদ্ধতির দিকে যাওয়া হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত প্রশাসনিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আমি পাইনি। তাছাড়া ওই কমিটির কাছে আমাদের বলা ছিল সার্বিকভাবে একটি সুপারিশ আমাদের জানাতে। আমাদের জানানো হয়নি। ফলে আমরা স্থায়ী পদ্ধতির দিকে যেতে পারছি না।’

তবে এ বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশে প্রশ্নপত্র ফাঁস তদন্তে গঠিত প্রশাসনিক কমিটির সদস্য বুয়েটের অধ্যাপক সোহেল রহমান বলেন, ‘আদালত আমাদের কাছে প্রতিবেদন চেয়েছিল। যথাসময়ে আমরা আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি। তবে তদন্ত কমিটিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব সদস্য ছিলেন। তার কাছ থেকে মন্ত্রণালয় পেতে পারে। আমরা দেখেছি বিগত পরীক্ষায় আমাদের দেওয়া সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়েছিল। ’

বর্তমান ব্যবস্থায় বাদ দিতে হবে এমসিকিউ

মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে পুরাতন পদ্ধতিতেই প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও ছাপার কাজ চলছে বছরের পর বছর। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও ছাপার কাজে সতর্ক ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা, আইনি পদক্ষেপ নেওয়া, প্রশ্নপত্র পরিবহন ও প্যাকেটজাত করার ক্ষেত্রে নতুন পদক্ষেপ, পরীক্ষার আধঘণ্টা আগে পরীক্ষার্থীকে হলে নিজ আসনে নেওয়াসহ সংশ্লিষ্ট সব সেক্টরকে কাজে লাগিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা হচ্ছে। তাতেও ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইন বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে যেকোনও একটিতে সামান্য অব্যবস্থাপনা, অবহেলা বা কেউ অসৎ হতে চাইলেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে।’প্রশ্ন ফাঁস

প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে উচ্চ আদালতের গঠিত কমিটির সদস্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক অধ্যাপক সোহেল রহমান বলেন, ‘তদন্ত করার সময় যা চেখে পড়েছে তাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার সুযোগ রয়েছে বিভিন্ন ধাপে। বর্তমান ব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে হলে বিজি প্রেসের সক্ষমতা বাড়ানোসহ গোপনীয়তার নিরাপত্তা আরও বাড়াতে হবে। প্রশ্নপত্র ছাপার সঙ্গে যুক্ত ১৫০ লোকবল না রেখে লোকবল কমাতে হবে। বিজি প্রেসের প্রতিটি কোনায় উন্নত সিসি ক্যামেরা বসাতে হবে। বহুনির্বাচনি প্রশ্নপত্রের একাধিক সেট ছাপাতে হবে। বর্তমান ব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি এড়াতে একাধিক বহুনির্বাচনি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র একাধিক সেটে ছাপানোর সুপারিশ করেছি। প্রয়োজনে বহুনির্বাচনি পরীক্ষা বন্ধ করার সুপারিশও করেছি। তবে আধুনিক যুগে বহুনির্বাচনি পরীক্ষা বাদ না দেওয়াই ভালো। স্থায়ী ব্যবস্থার দিকে যাওয়া উচিত। সেই সুপারিশও করেছি।’

বিজি প্রেসের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি

বর্তমান ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরে সোহেল রহমান বলেন, ‘বিজি প্রেসে গোপন শাখার ইনচার্জ (দায়িত্বশীল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা) নন, এমন ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে। আসলে কার কী দায়িত্ব তা ঠিক করা দরকার। পুলিশ আমাদের তল্লাশি করেছে (আগে ছিল না)। কিন্তু গুগল গ্লাস পরে ঢুকলে বুঝতেও পারতো না। আমরা ভেতরে ঢুকে দেখলাম প্রশ্ন ছাপা হচ্ছে, আমরা অনেকখানি প্রশ্ন দেখতেও পেয়েছে। সেখানে জায়গা কম, প্রশ্ন ছাপার পর স্তরে স্তরে সাজানো আছে প্যাকেট হওয়ার অপেক্ষায়, সেখানেও খানিটকা দেখা যাচ্ছে। গুগল গ্লাস নিয়ে গেলে দেখতে পারতাম। সিসি ক্যামেরায় সব জায়গা কাভার করে না।’

প্রশ্নফাঁসে বিব্রত সরকার

গত কয়েক বছর ধরে পাবলিক পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নফাঁস হওয়ায় বিব্রত পরিস্থিতিতে পড়ে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয় নানা উদ্যোগ নিলেও ব্যর্থ হয়। প্রশ্ন ফাঁসকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চ্যালেঞ্জ  ছুড়ে দিয়ে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটনায়। এই পরিস্থিতিতে সরকার কঠোর অবস্থান নেয়।

প্রশ্নফাঁস রোধে একাধিক কমিটি

প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ১১ সদস্যের কমিটি গঠন করে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ ও বিটিআরসি প্রতিনিধি, আট সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধি রাখা হয় ওই কমিটিতে। অন্যদিকে ২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদের নেতৃত্বে প্রশাসনিক কমিটি এবং ঢাকা জেলা ও দায়রা জজের নেতৃত্বে বিচারিক তদন্ত কমিটি গঠন করেন হাইকোর্ট। এসব কমিটি প্রশ্নফাঁস রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আপাতত প্রশ্নফাঁস রোধে বিভিন্ন সুপারিশ করে।

২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালের আগেও প্রশ্নফাঁস হয়েছিল পাবলিক পরীক্ষায়। ২০১৪ সালে ঢাকা বোর্ডের অধীন এইচএসসি পরীক্ষার ইংরেজি ও গণিত দ্বিতীয়পত্রের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। ওই ঘটনায় তখন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বর্তমান সিনিয়র সচিব (ওই সময় অতিরিক্ত সচিব) সোহরাব হোসাইনের নেতৃত্বে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির বিভিন্ন সুপারিশের মধ্যে একটি ছিল ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রশ্ন ছাপিয়ে পরীক্ষা নেওয়া।

স্থায়ী ব্যবস্থার সুপারিশ

প্রশ্নফাঁস রোধে স্থায়ী ব্যবস্থার বিষয়ে বুয়েটের শিক্ষক অধ্যাপক সোহেল রহমান বলেন, ‘প্রযুক্তিগত তিন থেকে চারটি সুপারিশ আমরা করেছি। কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র ছাপানোর কথা বলেছি। ‘ক্যামেরা রেডি কপি’ (মডারেটরদের নির্বাচিত কপি সরাসরি প্রেসে অবিকল ছাপানো) করবেন মডারেটররা সে সুপারিশ করেছি। প্রশ্ন তৈরি অবস্থায় প্রেসে গেলে ঝুঁকি কমে যাবে। অটোমেটিক প্রিন্টিং চালুর সুপারিশ করা হয়। এই প্রস্তাবটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রিন্টিং মেশিন কেনা দরকার। প্রশ্ন আনা-নেওয়ার জন্য স্মার্টবক্স  রাখতে হবে। যেকোনও সময় ওপেন করলে তা কেন্দ্র থেকেই জানা যাবে। যেখানে ইন্টারনেট কানেকটিভিটি নেই সেখানে কেন্দ্র না রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। স্থায়ী ব্যবস্থা প্রসঙ্গে বিজি প্রেসের সক্ষমতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন ধাপে পরিবর্তন আনার কথা জানিয়েছেন সোহেল রহমান।

প্রশ্নফাঁস রোধে সরকারের পদক্ষেপ

পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে কাজে লাগায় সরকার। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে তথ্য মন্ত্রণালয় ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিটিআরসিকে সম্পৃক্ত করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরীক্ষার ব্যবস্থা, প্রশ্নপত্র পরিবহন ব্যবস্থা, প্রশ্নপত্র প্যাকেটজাত করার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনাসহ কঠোর ব্যবস্থা নেয়। এসব ব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার আধঘণ্টা আগে হলে প্রবেশে বাধ্যবাধকতা দেওয়া হলে প্রশ্নপত্র ফাঁস সাময়িকভাবে রোধ করা সম্ভব হবে।