পর্দা নামলো অমর একুশে গ্রন্থমেলার। বইমেলা হিসেবেই আম-জনতার কাছে বহুল পরিচিত এই মেলা বরাবর ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে বিস্তৃত থাকলেও এবার মেয়াদ বাড়িয়ে মেলার বিস্তার ছিল মার্চের প্রথম দু’দিন পর্যন্ত।
আজ ২ মার্চ, রাত নয়টায় বন্ধ হয়ে যায় মেলার দরজা। মাসব্যাপী এই মেলা বরাবরের মতো এবারও ছিল লেখক প্রকাশক পাঠকের মিলনমেলা। এবারও বিদায়ের ঘণ্টা পড়ায় মন খারাপ করা আবহ ছিল সোহরাওয়ার্দীর বাতাসে। মেলায় লেখকরা বলছেন, বই নিয়ে, লেখা নিয়ে আবার কবে সবাই একসঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ পাবো কে জানে! আর প্রকাশকরা বলছেন, কেবল বইমেলা ঘিরে নয়, বইমেলার ভালোমন্দ নিয়ে সারাবছর আলাপ চালু থাক এটাই তাদের প্রত্যাশা।
আজ শনিবার মেলার শেষদিনে দেখা গেছে, যারা এতোদিন যাতায়াত করেছেন তারা শেষ সময়ে তালিকা হাতে নিয়ে স্টলে ঘুরে ঘুরে বই কিনছেন। বইমেলায় সন্তানদের চাহিদা অনুযায়ী তালিকা নিয়ে এসেছিলেন রাজিবুল ইসলাম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মোট ৬০টি বইয়ের তালিকা করেছে আমার তিন ছেলেমেয়ে। এসব বই কিনে আজ বাসায় ফিরবো। ২৭ ফেব্রুয়ারি কেনার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু সেদিন এত বৃষ্টি গেল। আর পরেরদিন তো নির্বাচনের কারণে বাসাবন্দি। মেলা দুইদিন না বাড়ালে মুশকিলে পড়ে যেতাম।’
কথা সাহিত্যিক আনিসুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এবার মেলা ভীষণ ভালো, পরিশীলিত গোছানো হয়েছে। আমার এবার 'এই পথে আলো জ্বেলে' নামে যে উপন্যাসটি বের হয়েছে সেটি একটি সিরিজের চতুর্থ সংখ্যা। পঞ্চমপর্বে গিয়ে আমার এই সিরিজ শেষ হবে। এই মার্চ থেকেই আমি সেটা লেখা শুরু করবো এবং আগামী বছর সিরিজ উপন্যাস লেখা থেকে আমার মুক্তি ঘটবে। আমি অধীর আগ্রহ নিয়ে আগামী বইমেলার অপেক্ষা করছি। আরেকটি বিষয় না উল্লেখ করলেই নয়, এবার প্রচুর ভালো বই প্রকাশিত হয়েছে। সেই বইগুলো সংগ্রহ করেছি। সেগুলো পড়ার জন্য অপেক্ষা করছি।
লেখক অদিতি ফাল্গুনী শেষদিনে বইমেলায় ছিলেন বেশকিছু সময়। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শুরুতে আমি একটু হতাশ হয়েছিলাম এই ভেবে যে সিরিয়াস বইয়ের পাঠক কম, বিক্রি কেমন না কেমন হবে। কিন্তু এখন মেলা শেষে দেখছি মানুষ আগ্রহ নিয়ে বই কিনছে। বইমেলা কেবল ঢাকায় না জেলাশহরগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে এই লেখক। তিনি আরও বলেন, ফেব্রুয়ারিতে যে বইগুলো বের হচ্ছে সেগুলো বাংলাদেশের নানা জায়গায় পৌঁছে দেওয়াটাও একটা কাজ। ফলে এটি আমাদের প্রকাশকরা যেন করেন সেই আহ্বান থাকবে।
বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক ও ভাষাচিত্রের স্বত্বাধিকারী খন্দকার মনিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মেলা শেষ হওয়ার পরও বই এবং লেখালেখি নিয়ে আলাপ জারি থাকলে আমাদের সাহিত্য অঙ্গন সমৃদ্ধ হতো। মেলাকেন্দ্রিক বই বের করার যে আগ্রহ সেটা যদি সারাবছর ধরে চলে তাহলে সময় নিয়ে মানসম্পন্ন বই করা সম্ভব। প্রতিবারই মেলা শেষ হওয়ার পর এমন আশা করি, একদিন নিশ্চয় আমাদের লেখক, পাঠক ও গণমাধ্যম সেটি বুঝতে পারবেন।
দু’দিন মেয়াদ বাড়ার কারণ
লেখক ও প্রকাশকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯ এর শেষদিনে সময়সীমা ০২ (দুই) দিন বাড়ানো হয়। পরপর কয়েকদিন বৈরী আবহাওয়া ও শেষ দিনে নির্বাচনের কারণে চলাচলে বাধা থাকায় মেলার সময় দুইদিন বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন প্রকাশক ও পাঠকরা। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ সিরাজী গত বৃহস্পতিবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘ প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন বিধায় আরও দুইদিন বইমেলা চলবে।’
ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) এর পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এবারের মেলা দুর্যোগের কবলে পড়েছিল অনেকটা। এই আবহাওয়ার জন্য আমাদের প্রস্তুতি ঠিকঠাক ছিল না। ফলে দুইদিন বাড়ানোটা খুব ভালো সিদ্ধান্ত ছিল। আগামীতে মেলায় এই দিকটা প্রত্যেকে নজরে রাখলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে না।
মেলায় প্রকাশিত ৪,৮৩৪টি বইয়ের মধ্যে মানসম্পন্ন ১,১৫১টি
বাংলা একাডেমি আজ শনিবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মেলার শেষদিনে নতুন বই এসেছে ৬৩টি। আর অমর একুশে গ্রন্থমেলার শেষদিন পর্যন্ত সর্বমোট প্রকাশিত নতুন বইয়ের সংখ্যা ৪,৮৩৪টি। এর আগে মেলার সময় দু’দিন বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলা একাডেমি ১,১৫১টি গ্রন্থকে মানসম্পন্ন হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন দিয়েছিল। সেদিন জানানো হয়, এবারের মেলা থেকে বাংলা একাডেমি আয় করেছে দুই কোটি টাকার বেশি।
গ্রন্থমেলায় বিষয়ভিত্তিক বই
এবারের মেলায় সবচেয়ে বেশি এসেছে কবিতার বই। এর সংখ্যা ১ হাজার ৬০৮টি। এরপরই অবস্থান গল্পের বইয়ের। প্রকাশিত হয়ে ৭৫৭টি। এছাড়া একাডেমির হিসেব বলছে, মেলায় এসেছে উপন্যাস-৬৯৮টি, প্রবন্ধ-২৭২টি, গবেষণা-৮০টি, ছড়া-১৪৮টি, শিশুতোষ-১৫০টি, জীবনী-১৬৭টি, রচনাবলী-১৫টি, মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত বই-১১০টি, নাটক-৪৩টি, বিজ্ঞান বিষয়ক বই ৭৭টি, ভ্রমণ বিষয়ক বই-৮৫টি, ইতিহাস বিষয়ক বই-৭৭টি, রাজনীতি বিষয়ক বই-৩৩, রম্য/ধাঁধা সংক্রান্ত বই-৩৭টি, কম্পিউটার সংক্রান্ত বই-৫টি, ধর্মীয় সংক্রান্ত বই-২৫টি, অনুবাদ-৩৮টি, অভিধান-৬টি, সায়েন্স ফিকশন-৪৫ এবং অন্যান্য-৩৩০টি।