পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুড়ে যাওয়া ‘ওয়াহেদ ম্যানশন’ এখনই ব্যবহার করা যাবে না বলে জানিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি। এতে বলা হয়েছে আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে ভবনটির ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট (ডিইএ) করতে হবে। ডিইএ’র রিপোর্ট অনুযায়ী পরের ১৫০ দিনের মধ্যে নতুন করে প্রয়োজনীয় মজবুত (রেট্রোফিটিং) করতে হবে। এ দুটি সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ভবনটি ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া বাকি চারটি ভবনের সামনের দিকের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ভেঙে মেরামতের পর ডিএসসিসি ও রাজউকের যথাযথ অনুমোদনের পর ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের কাছে গঠিত কমিটির পেশ করা প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। রবিবার (৩ মার্চ) কমিটি এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি মেয়রের কাছে হস্তান্তর করে।
এ বিষয়ে ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের গঠন করা কমিটি তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। আমি প্রতিবেদনটি পেয়েছি। এতে দেখা গেছে ওয়াহেদ ম্যানশনটি ছাড়া বাকি ভবনগুলোতে কিছুটা কাজ করলে এখনই ব্যবহার করা যাবে। ওয়াহেদ ম্যানশনটির আরও প্রকৌশলগত পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা সেগুলো করার জন্য কাজ করছি। প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো আমরা বাড়ি মালিকদের কাছে পাঠিয়ে দেবো।
চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর ওয়াহেদ ম্যানশনসহ পার্শ্ববর্তী ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ পেশ করার জন্য অগ্নিকাণ্ডের পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এই কমিটি গঠন করে। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম। আর সদস্য সচিব ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) মুনসী মো. আবুল হাসেম। বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী ছাড়াও অন্য সদস্যরা হলেন বুয়েটের অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমেদ, ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লে. কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান, ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পুর ও বিদ্যুত যথাক্রমে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ও জাফর আহম্মেদ, ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম, রাজউকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শাহ আলম ও অথরাইজ কর্মকর্তা নুরুজ্জামান জহির।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিটি গঠনের পরের দিন সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে ওয়াহেদ ম্যানশনসহ আরও চারটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শন শেষে কমিটি ওয়াহেদ ম্যানশনের আল্ট্রসনিক পালস ভ্যালোসিটি (ইউপিভি) ও কার্বোনেশন টেস্ট অব কংক্রিট করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই মধ্যে এ দুটি সম্পন্ন হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে বিস্ফোরণ ও আগুনের কারণে ওয়াহেদ ম্যানশনের কলাম ও বিমের যেসব অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পুড়ে যাওয়া সেসব অংশ পুরোপুরি ফেলে দিতে হবে। এরপর নতুন করে রড ও কংক্রিটের ঢালাই করে মজবুত করতে হবে।
এতে আরও বলা হয়েছে- ভবিষ্যতের জন্য ভবনটি কতটা নিরাপদ সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পুরো ভবনটির একটি বিস্তারিত প্রকৌশলগত মূল্যায়ন (ডিটেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট-ডিইএ) করতে হবে। এজন্য অত্যাধুনিক মেশিনের সাহায্যে পুরো ভবনের সব কলাম, বিম, স্ল্যাব ভালো করে পরীক্ষা করতে হবে। এ সংক্রান্ত সার্টিফিকেট পাওয়ার পর ভবনটি ব্যবহার করার অনুমোদন প্রদান করা যেতে পারে।
ওয়াহেদ ম্যানশন ছাড়াও তার পার্শ্ববর্তী চারটি ভবন ( হোল্ডিং নং-৬৫,১৮,১৭ এবং চুড়িহাট্টা মসজিদ) বাহ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবনগুলোর সামনের দিকের বর্ধিত অংশ ভেঙ্গে মেরামত করা প্রয়োজন। মেরামতের পর ডিএসসিসি ও রাজউকের যথাযথ অনুমোদনের পর ব্যবহার করা যেতে পারে।
তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারীর বলেন, ‘বাড়িটি রাখা যাবে কী যাবে না’-এ বিষয়ের তদন্ত করেছি আমরা। এটা “রেট্রোফিটিং” করতে হবে, কারণ বাড়ির অনেক বিম ও কলামে ক্র্যাক আছে। ভবনটি ঠিক আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট (ডিইএ) বা প্রকৌশলগত বিস্তারিত মূল্যায়ন করতে হচ্ছে। যেহেতু এখানে মানুষ থাকবে।’
তিনি জানান, ওয়াহেদ ম্যানশনের পার্শ্ববর্তী চারটি বাড়ির বড় সমস্যা নেই। সামান্য মেরামতে কাজ হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চকবাজারের চুড়িহাট্টার এ জায়গায় নয়তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের জন্য ১৯৯৬ সালে নকশার অনুমোদন দেয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। তবে চারতলা পর্যন্ত করার পর আর তলা বাড়ানো হয়নি।
চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শিল্প মন্ত্রণালয় থেকেও ১২ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তবে ওই কমিটি এখনও রিপোর্ট পেশ করেনি। এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডের পর ২১ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকায় প্রতিটি রাস্তা ও বাড়িঘরের তালিকা করার জন্য একটি কমিটিকে দায়িত্ব দেয় রাজউক।
উল্লেখ্য, গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সেদিনই ৬৭ জন ও পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৬ জনের প্রাণহানি ঘটে।