ব্রুনাই সফর দু’দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে: প্রধানমন্ত্রী

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী, ছবি: ফোকাস বাংলাপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সার্বিক বিবেচনায় ব্রুনাই সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। সফরকালে ব্রুনাইয়ের সুলতান আমার এবং আমার সফরসঙ্গীদের প্রতি যে আতিথেয়তা ও সম্মান দেখিয়েছেন তা ছিল খুবই বিরল। আমাদের এ সফর দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আর সুদৃঢ় করবে বলে আমার বিশ্বাস।’
শেখ হাসিনা শুক্রবার (২৬ এপ্রিল) বিকালে গণভবনে ব্রুনাই সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের এসব কথা বলেন।
ব্রুনাইয়ের সুলতান হাসানাল বলকিয়ার আমন্ত্রণে ২১-২৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী সে দেশ সফর করেন। কৃষিমন্ত্রী, বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়; প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীগণসহ উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা তার সফরসঙ্গী ছিলেন।
এছাড়া, দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে গঠিত ৫৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলও তার সফরসঙ্গী হন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সফরকালে তিনি ব্রুনাইয়ের সুলতান হাজী হাসানাল বলকিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাসহ সুলতান এবং রাজপরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বাংলাদেশ-ব্রুনাই বিজনেস ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানসহ বেশ কিছু কর্মসূচিতে যোগ দেন।
ব্রুনাইয়ের সুলতানের সরকারি বাসভবন নুরুল ইমান-এ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ব্রুনাইর সুলতান হাসানাল বলকিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে কৃষি, মৎস্য, পশুসম্পদ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি এবং এলএনজি সরবরাহ সংক্রান্ত সাতটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
তিনি ব্রুনাইয়ের রাজধানীতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের নতুন চ্যান্সেরি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তৃতার পরে প্রধানমন্ত্রী ২১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে সিরিজ বোমা হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সমগ্র বিশ্বে একযোগে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি এ ঘটনায় নিহত তার ফুফাতো ভাই শেখ সেলিমের নাতি জায়ান চৌধুরীসহ অন্যদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন। ঘটনায় আহত জায়ানের বাবা মশিউল আলম চৌধুরীসহ আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন তিনি। শেখ হাসিনা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনাও জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রবিবার ব্রুনাই দারুস সালাম-এর রাজধানী বন্দর সেরি বাগওয়ানের বিমানে থাকা অবস্থায় হামলার খবর পান। পরে বিমানবন্দরে নামার পরপরই তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত খবর পান এবং এর কিছুক্ষণ পর জায়ানের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি এই নৃশংস হামলার নিন্দা জানিয়ে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রীকে শোকবার্তা পাঠাই। আমি এই কাপুরুষোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে জনমত সৃষ্টি ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
প্রধানমন্ত্রী লিখিত বক্তৃতায় বলেন, ২১ এপ্রিল বিকালে তিনি ব্রুনাই বিমানবন্দরে পৌঁছলে যুবরাজ আল মুহাতাদি বিল্লাহ তাকে স্বাগত জানান। বিমানবন্দরে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী, ছবি: ফোকাস বাংলাতিনি বলেন, একইদিন সন্ধ্যায় তিনি ব্রুনাই দারুস সালামে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেন। সফরের দ্বিতীয় দিনে ব্রুনাইয়ের সুলতানের রাজপ্রাসাদে সুলতান ও রাজপরিবারের সঙ্গে তার এবং সফরসঙ্গীদের শুভেচ্ছা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর রাজপ্রাসাদের সভাকক্ষে বাংলাদেশ ও ব্রুনাই দারুস সালামের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। বৈঠকে তিনি বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের এবং ব্রনাইয়ের সুলতান তার দেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আমি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ে সফর বিনিময়, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, খাদ্য, কৃষি, মৎস্য, জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, বিমান যোগাযোগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করি।’
তিনি বলেন, ব্রুনাইয়ের পক্ষে সুলতান তার প্রস্তাবসমূহকে স্বাগত জানান এবং এগুলো বাস্তবায়নে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। ব্রুনাইয়ে দারুসসালাম খাদ্য ও কৃষি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন উল্লেখপূর্বক এসব ক্ষেত্রে ব্যাপকভিত্তিক দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করে। কৃষি ক্ষেত্রে কারিগরি সহযোগিতাসহ যৌথভাবে খামার স্থাপন, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিপণ্যের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সম্ভাবনা বিবেচনার বিষয়ে দু’পক্ষ একমত হয়। দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চালুর জন্য সমীক্ষা পরিচালনা এবং ভবিষ্যতে দ্বৈতকর অব্যাহতি চুক্তি এবং পারস্পরিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ চুক্তির সম্ভাব্যতা বিবেচনার সিদ্ধান্ত হয়।
তিনি বলেন, বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ শিল্প, পর্যটন অবকাঠামো, পাট শিল্প ইত্যাদি প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়।
স্বাস্থ্য খাতে প্রশিক্ষণ ও পেশাজীবীদের নিয়োগ, ওষুধ উৎপাদন ও বাণিজ্য, বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপনসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে বাংলাদেশ ও ব্রুনাই ঐকমত্য পোষণ করে।
এছাড়া, দ্বিপক্ষীয় বিনিময় ও সহযোগিতা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে দু’দেশের মধ্যে আর্থিক খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়। সামরিক খাতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়। একইসঙ্গে  দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রবাসী কর্মীদের অবদান উল্লেখপূর্বক এক্ষেত্রে নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়ে দুই দেশই একমত হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে দু’দেশের জনসাধারণের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয় এবং এ লক্ষ্যে শিক্ষা, সংস্কৃতি, যুব ও ক্রীড়া, পর্যটন, বিমান চলাচল খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে আমরা একমত হই।
সরকার প্রধান বলেন, ব্রুনাইয়ের সুলতান বাংলাদেশের অভূতপূর্ব আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ভূয়সী প্রসংশা করেন। সুলতান শান্তিরক্ষা মিশনসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করেন। আসিয়ান, ওআইসি, কমনওয়েলথ, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে মতৈক্য হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সুলতান রোহিঙ্গা সমস্যার ন্যায়ভিত্তিক ও স্থায়ী সমাধানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আসিয়ান দেশসমূহের অধিকতর অংশগ্রহণ ও কার্যকর ভূমিকা পালন নিশ্চিত করার বিষয়ে আমি সুলতানের সহযোগিতা কামনা করি।’
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাঁচটি ওআইসি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক বিনিময় বৃদ্ধির জন্য আঞ্চলিক ফোরাম গঠনের বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্যোগের প্রতি সুলতান সমর্থন ব্যক্ত করেন এবং আসিয়ানের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর দু’দেশের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৬টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়াও, এ সফরে কূটনৈতিক ও সরকারি পাসপোর্ট বহনকারীদের পারস্পরিক ভিসা অব্যাহতির লক্ষ্যে কূটনৈতিক পত্র বিনিময় হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি ব্রুনাই সুলতানকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালে তিনি তা গ্রহণ করেন এবং সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন।
সরকার প্রধান বলেন, বিকেলে তিনি বাংলাদেশ-ব্রুনাই যৌথ বিজনেস ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের উদার বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে তুলে ধরেন এবং ব্রুনাইর বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২৩ এপ্রিল সকালে তিনি ব্রুনাইয়ের রাজধানীতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের নতুন চ্যান্সেরি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং পরে ব্রুনাইয়ের রাজকীয় রিগালিয়া জাদুঘরও পরিদর্শন করেন। খবর বাসস।