বেসরকারি কলেজে অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগে সংকট কাটছে না

২০১৯ সালের পরিপত্র

ঊনত্রিশ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন মো. আবুল হোসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনার্স পাসের পর শিক্ষকতা করার ব্রত নিয়ে ১৯৮৯ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর থেকে ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন এবং মাস্টার্স করেন। রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১৯৯০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর শিক্ষকতা শুরু করেন আবুল হোসেন। ২০০০ সালের ১৪ মে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের কলেজ সেকশনে যোগ দেন। কলেজের শিক্ষক হিসেবে এমপিওভুক্ত হন ২০১২ সালের ১ নভেম্বর।

সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন জানান, নিয়োগ পরীক্ষার চূড়ান্ত পর্বে ৬০০ জনের মধ্যে প্রথম হয়ে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাধ্যমিক শাখায় শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ৮৯ প্রার্থীর মধ্যে প্রথম হয়ে কলেজ শাখায় নিয়োগ পান। বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত আছেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগে প্রার্থী হতে পারছেন না। চাকরির শেষ জীবনে তাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বও ছেড়ে দিতে হবে পদোন্নতি না পেয়েই।

একই কলেজের আরেক সহকারী অধ্যাপক মশিউর রহমান। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষকতায় যোগ দেন ২০০৩ সালে। সম্প্রতি তিনি পিএইচডিও করেছেন। কিন্তু ২০১৯ সালের পরিপত্র অনুযায়ী, অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদে প্রার্থী হতে পারছেন না তিনি। শুধু এই দুই শিক্ষকের বেলায় এমনটি ঘটেছে তা নয়, দেশের অনেক শিক্ষকই সব ধরনের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষ পদের জন্য আবেদন করতে পারছেন না।

মশিউর রহমান বলেন, ‘১৫ বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। সর্বোচ্চ যোগ্যতা অর্জনের পরও অধ্যক্ষ পদে প্রার্থী হতে পারছি না, মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জারি করা একটি পরিপত্রের শর্তের কারণে।’

পরিপত্র অনুযায়ী শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা যত বছরেরই হোন না কেন, এমপিওভুক্ত হিসেবে সহকারী অধ্যাপক পদে ন্যূনতম তিন বছরের অভিজ্ঞতাসহ মোট ১২ বছরের অভিজ্ঞতা না থাকলে, তিনি অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষ হতে পারবেন না। এই দুটি পদে নিয়োগের যোগ্যতায় এমন শর্ত জুড়ে দিয়ে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পরিপত্র জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর থেকে কোনও বেসরকারি কলেজে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নিয়োগ হচ্ছে না।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি কলেজগুলোতে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নিয়োগ বন্ধ থাকায় ভারপ্রাপ্ত দিয়েই দীর্ঘদিন ধরে চলছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে ম্যানেজিং কমিটির জন্য অনিয়ম-দুর্নীতির পথ আগের মতোই খোলা থেকে যাচ্ছে।

পরিপত্রে যা বলা হয়েছে

২০১৯ সালের পরিপত্রে বেসরকারি স্কুল ও কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগের যোগ্যতা পুনর্নির্ধারণ করে বলা হয়েছে— ‘স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকসহ (সম্মান) স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অথবা স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকসহ (পাস) স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকতে হবে। স্নাতক (পাস) অথবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রির যে কোনও একটিতে প্রথম শ্রেণি থাকতে হবে। শিক্ষা জীবনের কোনও একটি স্তরেও তৃতীয় শ্রেণি গ্রহণযোগ্য হবে না।’

আর অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে— ‘মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের অধ্যক্ষ ও ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ পদে এমপিওভুক্ত হিসেবে কর্মরত। অথবা এমপিওভুক্ত হিসেবে সহকারী অধ্যাপক পদে ন্যূনতম তিন বছরের অভিজ্ঞতাসহ মোট ১২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।’

শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের শর্তের চেয়ে অভিজ্ঞতা নির্ধারণের সমস্যাই এই সংকট সৃষ্টি করেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

২০১৮ সালের নীতিমালা

যে কারণে যোগ্য প্রার্থীর সংকট

শিক্ষকরা আরও জানান, ২০ বছরের শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা থাকার পরও এমপিওভুক্ত হিসেবে সহকারী অধ্যাপক পদে তিন বছরের অভিজ্ঞতাসহ মোট ১২ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রার্থী সংশ্লিষ্ট কলেজগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার এমপিওভুক্তসহ ১২ বছরের অভিজ্ঞ শিক্ষক পাওয়া গেলেও শিক্ষাগত যোগ্যতায় তৃতীয় শ্রেণি থাকার কারণে বেশিরভাগ শিক্ষক আবেদনের যোগ্য হচ্ছেন না। অন্যদিকে, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রার্থী যেসব কলেজে রয়েছেন, সেখানে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদ ফাঁকা নেই। প্রতিষ্ঠিত কলেজ থেকে শুধু অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষ হওয়ার জন্য অপেক্ষাকৃত দুর্বল কলেজে কেউই আবেদন করছেন না। এসব কারণে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নিয়োগ মূলত বন্ধই থেকে যাচ্ছে।

অধ্যক্ষ নিয়োগে আগ্রহ নেই প্রতিষ্ঠানের

শিক্ষকরা জানান, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত কলেজগুলোতে নিজেদের শিক্ষকদের প্রার্থী হিসেবে না পাওয়ায় অন্য কলেজের প্রার্থীকে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না কেউ। সে কারণে অনেক কলেজই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করছে না। এ অবস্থায় অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের পদ শূন্যই রয়ে যাচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে জারি করা বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষকদের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালাতে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে তৃতীয় শ্রেণি থাকা না থাকার বাধ্যবাধকতা ছিল না। কিন্তু, ২০১৯ সালের পরিপত্রে বলা হয়েছে— জীবনের কোনও একটিতেও তৃতীয় শ্রেণি গ্রহণযোগ্য হবে না। এ ক্ষেত্রে যারা বর্তমানে কর্মরত আছেন, তারাও ভবিষ্যতে অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষের পদে পদোন্নতি পাবেন না। যদিও এখন প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষা জীবনের একটিতেও তৃতীয় শ্রেণি চলবে না— এমন বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে ভবিষ্যতেও অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থী সংকট দেখা দেবে বলে জানান মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন থেকেই প্রবেশন পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণে সংশোধনী এনে শিক্ষা জীবনের কোনও একটিতে তৃতীয় শ্রেণি গ্রহণযোগ্য হবে না করতে হবে, অথবা অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ বা পদোন্নতিতে তৃতীয় শ্রেণি থাকা না থাকার বাধ্যবাধকতা তুলে দিতে হবে।

মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক) জাবেদ আহমেদ বলেন, ‘অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে সার্বোচ্চ স্ট্যান্ডার্ড রক্ষার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে প্রবেশন পদের নিয়োগে শিক্ষাগত যোগ্যতার উন্নয়ন ঘটনো হবে।’

নীতিমালা ও পরিপত্রে সংশোধন আনা হবে কিনা জানতে চাইলে জাবেদ আহমেদ বলেন, ‘নীতিমালা সংশোধনের কাজ চলছে। পরিপত্র সবেমাত্র জারি করা হয়েছে। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে সমস্যা থাকলে পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’

 

সংকট নিরসনে দুই শিক্ষকের আবেদন

শিক্ষকদের দাবি

পরিপত্রে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নিয়োগে অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে ‘এমপিওভুক্ত হিসেবে তিন বছরসহ ১২ বছরের অভিজ্ঞতা’ শর্তের এমপিওভুক্ত শব্দটি নিয়ে শিক্ষকরা আপত্তি তুলেছেন। এরইমধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর বিষয়টি সুরাহার জন্য আবেদন জানিয়েছেন কেউ কেউ। আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন এবং মো. মশিউর রহমানও। আবেদনে তারা বলেছেন, ২০১৮ সালের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় যোগ্যতার ক্ষেত্রে সহকারী অধ্যাপকদের জন্য এমপিওভুক্তির কোনও শর্ত আরোপ করা হয়নি। ওই নীতিমালার আলোকে ২০১৯ সালে অধ্যক্ষ নিয়োগ সংক্রান্ত জারি করা পরিপত্রে যোগ্যতার ব্যাপারে এমপিওভুক্তির যে শর্ত আরোপ করা হয়েছে— তা ২০১৮ সালের অধ্যক্ষ নিয়োগ নীতিমালার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। এ কারণে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দক্ষ কিন্তু বিলম্বে এমপিও পাওয়া শিক্ষকরা অধ্যক্ষ পদে আবেদন করা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তুলে ধরেছেন তারা। একই সঙ্গে এই সংকটের সমাধান চেয়েছেন বঞ্চিত এই দুই শিক্ষক।