ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র তারকা ও অভিনেতাদের দিয়ে ‘প্রচারণা’ চালানো নিয়ে এরই মধ্যে কম জলঘোলা হয়নি। এ পটভূমিতে রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে খুন করতে ‘বাংলাদেশি ভাড়াটে খুনি’দের কন্ট্রাক্ট দেওয়ার অভিযোগ উঠলো।
তৃণমূল সরকারের খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক অভিযোগ করেছেন, বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপির প্রার্থী শান্তনু ঠাকুর তাকে খুন করাতে ‘বাংলাদেশের ভাড়াটে খুনি’ বা সুপারি কিলারদের কাজে লাগিয়েছেন। তারা নাকি সেই ‘কন্ট্রাক্ট’ও নিয়েছিল, কিন্তু যাকে খুন করতে হবে তিনি একজন মন্ত্রী, এটা জানতে পারার পর তারা নাকি পিছিয়ে যায়!
জ্যোতিপ্রিয় বলেন, “গত রবিবার (৫ মে) সকালে আমার একজন সহযোগীর ফোনে বাংলাদেশ থেকে একটা ফোন আসে। আমি তখন ওর ঠিক পাশেই ছিলাম। ওরা নিজেদের পরিচয় দেয় ‘সুপারি কিলা’র বলে আর জানায়, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলে ভারতে একজনকে খুন করার জন্য তারা অর্ডার নিয়েছিল।”
তিনি বলেন, কিন্তু তিনি (জ্যোতিপ্রিয়) যে পশ্চিমবঙ্গের একজন মন্ত্রী, সেটা তাদের জানা ছিল না। জানার পরই তারা অর্ডার ক্যানসেল করে দেয়, আর সেটা বলতেই তারা ফোনটা করেছিল।
জ্যোতিপ্রিয় বলেন, ‘আপনার বসকে বলে দেবেন, আমরা কাজটা নিইনি। তবে উনার লাইফ রিস্কে আছে, উনি যেন সাবধানে থাকেন, বলেই ফোনটা কেটে দেয় ওরা।’
জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক জানিয়েছেন, নিজস্ব সূত্রে তিনি আরও খবর পেয়েছেন, বনগাঁর বিজেপি প্রার্থী শান্তনু ঠাকুরই বাংলাদেশের এই ‘সুপারি কিলার’দের ভাড়া করেছিলেন। খুব সম্ভবত তারা সীমান্তের অন্য পারে যশোর-খুলনা অঞ্চলেরই দাগী অপরাধী।
বিজেপি প্রার্থী শান্তনু ঠাকুর নিজেই কয়েক দিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়েছিলেন। ভোটের প্রচার চালানোর সময় তিনি নিজের গাড়িতে যাচ্ছিলেন, তখন একটি এসইউভি এসে তীব্র গতিতে তার গাড়িতে ধাক্কা মারে। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি।
ওই ঘটনার পর শান্তনু নানাভাবে অভিযোগ করেছিলেন, ওটা দুর্ঘটনা নয়, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার জন্যই এলাকার প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা ও রাজ্যের মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন।
জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের পাল্টা অভিযোগের ব্যাপারে তার বক্তব্য জানতে শান্তনু ঠাকুরের সঙ্গে যোগাযোগ হলে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে গেছেন। উনাকে মারার জন্য আমি বাংলাদেশের খুনি ভাড়া করবো, এটা বনগাঁ-গাইঘাটা তল্লাটে একটা লোকও বিশ্বাস করবে না! আসলে বনগাঁয় তৃণমূলের হার অবধারিত, এটা বুঝেই তিনি এইসব উল্টোপাল্টা বকছেন!’
বনগাঁ অঞ্চলের স্থানীয় মানুষজন বলছেন, এলাকার ‘মতুয়া মহাসংঘে’র রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে যে তুমুল লড়াই ও তিক্ত সংঘাত চলছে— এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তারই প্রতিফলন।
জানা গেছে, মতুয়া মহাসংঘ হলো বাংলাদেশ (বা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) থেকে আসা নিম্নবর্ণের হিন্দু বা নমশূদ্রদের একটি ধর্মীয় সংগঠন। এটির সদর দফতর বনগাঁতেই। প্রায় এক কোটি মানুষ এই সংঘের অনুসারী। বলা হচ্ছে, এই সংঘের অনুসারীদের ভোট দখল করতে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে লড়াই চলছে বেশ কয়েক বছর ধরে।
গত কয়েক মাসের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে শুরু করে তৃণমূল প্রধান ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, দুজনেই ঘুরে গেছেন মতুয়া মহাসঙ্ঘে।
সংঘের বর্তমান প্রধান মমতাবালা ঠাকুর তৃণমূলের একজন এমপি। তার প্রয়াত স্বামী কপিলকৃষ্ণ ঠাকুরও তৃণমূলের এমপি ছিলেন। কপিলকৃষ্ণের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী ওই আসনের উপনির্বাচনে জিতে পার্লামেন্টে যান। কিন্তু এবারে তাকে লড়তে হচ্ছে নিজের দেবরের ছেলে শান্তনু ঠাকুরের বিরুদ্ধে, যিনি বনগাঁ আসনে বিজেপির মনোনয়ন পেয়েছেন।
শান্তনু ঠাকুরের বাবা মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুরও একসময় মমতা ব্যানার্জির মন্ত্রিসভায় সদস্য ছিলেন। কিন্তু নানা কারণে তৃণমূলের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়। তিনি ভিড়েছেন বিজেপি শিবিরে। এলাকায় ডাকসাইটে তৃণমূল নেতা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের সঙ্গে তার সম্পর্কও আদায়-কাঁচকলায়। ফলে এইসব পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতা দখলের লড়াই আর তার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা— সব মিলিয়ে বনগাঁর ভোটে সংঘাত আর কাদা ছোড়াছুড়ির কোনও অভাব ছিল না প্রথম থেকেই। তার সঙ্গে কথিত বাংলাদেশি ‘ভাড়াটে খুনি’ তাতে এখন একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তৃণমূলে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের একজন ঘনিষ্ঠ সহচর এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা খুব ভালোমতো জানি বাংলাদেশে ক্রিমিনালদের সঙ্গে মঞ্জুলকৃষ্ণ ও তার ছেলে শান্তনুর খুব ভালো কানেকশন আছে। কাজেই নেতাকে সরাতে হলে ওরা বর্ডারের ওপারের লোকজনদেরই কাজে লাগাতে চাইবে। কারণ, ইন্ডিয়ার ক্রিমিনালদের ধরা পড়ে যাওয়ার চান্স অনেক বেশি।’
অবশ্য এ কথা হেসেই উড়িয়ে দেন শান্তনু ঠাকুর ও তার অনুগামীরা। তারা বলেন, ‘দুর্নীতিবাজ বালুকে (জ্যোতিপ্রিয়র ডাক নাম) এলাকার মানুষ বোধহয় একদিন নিজেরাই পিটিয়ে মেরে ফেলবে। তার জন্য বাংলাদেশের কাউকে লাগবে না, দেখে নেবেন!’