মশার ওষুধ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেওয়ায় ডিএনসিসি তাদের ওষুধ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করেছে। গত ১৫ জুলাই সংস্থার মেয়র আতিকুল ইসলামের নেতৃত্বে এ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যসচিব করা হয় ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুর রহমান মামুন। অন্যান্য সদস্যরা হলেন, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের (সিডিসি) পরিচালক সেবা প্রতিনিধি, রোগতত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক বা প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) প্রতিনিধি, সিডিসির কীটতত্ত্ববিদ, উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখার প্রতিনিধি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার, বাংলাদেশ ক্রপ প্রটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিপিএ) সভাপতি এ কে এম আজাদ ও কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী।
এ কমিটি মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক নির্বাচন ও কার্যকারিতা পরীক্ষার পাশাপাশি ক্রয় প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা ও কীটনাশকের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করবে। ওই বৈঠকে বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর সেগুলো পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি নতুন কীটনাশক না কেনা-পর্যন্ত বর্তমানে ব্যবহৃত কীটনাশকের ঘনত্ব বাড়িয়ে ডিএনসিসিকে ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন বৈঠকে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু কমিটি গঠনের দুই সপ্তাহ পার হওয়ার পরও এখনও কোনও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি। কমিটি কোনও প্রতিবেদনও দেয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুর রহমান মামুন বলেন, ‘ওষুধ নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠার পর আমরা একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছি। কমিটি বলেছে, এজন্য তারা সরেজমিনে নিরীক্ষা করতে হবে। তাদের রিপোর্ট পাওয়ার পর আমরা ব্যবস্থা নেবো।
এদিকে, এই কমিটি গঠনের ৮দিন পর জুলাই ২৩ একই সংস্থাগুলোকে নিয়ে আরও একটি কমিটি গঠন করে ডিএসসিসি। বলা হয়েছে, এই কমিটি প্রতি তিন মাস পরপর বৈঠক করে মশার ওষুধ বিষয়ে অভিমত দেবে। ওই বৈঠক শেষে সংস্থাটির মেয়র মো.সাঈদ খোকন বলেন, ‘ডিএসসিসিতে ব্যবহৃত মশার ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। সমালোচনা নিরসনে ডিএসসিসি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সরকারের ম্যান্ডেট পাওয়া সংস্থা রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে (আইইডিসিআর) আমরা আমাদের মশার ওষুধ সরবরাহ করবো। তারা এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যদি ঠিক বলে জানায়, তবে আমরা তা ব্যবহার করবো। আর যদি জানায়, এর কোনও একটি অংশ অকার্যকর, তবে তাদের সাজেশন আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে পাঠাবো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পেলেই আমরা ব্যবহার শুরু করবো।’
মেয়রের এমন সিদ্ধান্তের পর দিন আইইডিসিআরে আবার পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠানো হয়। কিন্তু রবিবার পর্যন্ত সেই নমুনার ফল সিটি করপোরেশনে পৌঁছেনি।
বিষয়টি নিয়ে মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, ‘আমরা ওষুধ কেনার পর তিনটি প্রতিষ্ঠানে নমুনা পাঠাই। সেই নমুনা পরীক্ষা হয়। পরীক্ষায় আমাদের ব্যবহৃত ওষুধগুলো সন্তোষজনক বলে রিপোর্ট দিয়েছে। এরপর আমরা এই ফল বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার কাছে পাঠাই। সেখান থেকে অ্যাপ্রুভ হলে এরপর ব্যবহার করে থাকি।’
তাহলে এই ওষুধ আবার পরীক্ষা করতে হচ্ছে কেন? বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্টে এর মান কেন খারাপ আসছে? এমন প্রশ্নের জবাবে সাঈদ খোকন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণের পর ওষুধের গুণগত মান খারাপ হতে পারে। আমরা আবারও পরীক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছি। তবে এ যাবত যত পরীক্ষা হয়েছে, সেগুলোয় আমাদের ওষুধের নতুন নেওয়া হয়নি।’
এরআগে, শনিবার (২০ জুলাই) রাজধানীর বনানীতে নিজ বাসভবনে মেয়র সাঈদ খোকন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পাঁচ সদস্যের এক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে তিনি জানান, ‘আমাদের ওষুধের বিস্তারিত ফল আমরা ডব্লিউএইচও’র কাছে পাঠিয়েছি। আমাদের ওষুধগুলো কার্যকর কিনা, তারা পরীক্ষা করে দেখবে। ওষুধে কোনও পরিবর্তন দরকার কিনা, দরকার হলে তা কেমন হবে, নতুন কোনও ওষুধ দরকার কিনা, এসব তারা আমাদের দ্রুত জানাবেন।’
জানতে চাইলে সংস্থাটির সহকারী ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা লিয়াকত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে, ‘আমাদের ওষুধ পরীক্ষা করার জন্য আবারও আইইডিসিআরে পাঠিয়েছি। তারা রিপোর্ট দিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত আগের মতোই ব্যবহার করা হচ্ছে। আর আমরা ওষুধ কেনার সময় সরকারি এই প্রতিষ্ঠান থেকেই পরীক্ষা করে নিয়ে থাকি।’
প্রসঙ্গত, ডিএসসিসির ওষুধের নমুনা পরীক্ষা করে গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর এর ফল দেয় আইইডিসিআর। এতে তিনটি নমুনার ফল সন্তোষজনক বলে মন্তব্য করা হয়। কিন্তু এরপরও মশা মরতে দেখা যায়নি। নানা ক্র্যাশ প্রোগ্রাম বা বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেও ডেঙ্গু পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণে আসছে না। ওষুধ নিয়ে সন্দেহ আর সমালোচনা থাকলেও সেই ওষুধ এখনও পরিবর্তন করা হয়নি।