এডিস মশা নিধন ও ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে বিদেশ থেকে চারটি কার্যকর ওষুধ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। তবে এই তালিকায় থাকা দুটি ওষুধের মান নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন ওঠায় সেগুলোর নমুনা আর আমদানি করেনি সংস্থাটি। গত সোমবার বিমানযোগে আমদানির পর মঙ্গলবার ফিল্ড টেস্টে নিষিদ্ধ ঘোষিত দুটি ওষুধ দেখা যায়নি। তবে অন্য যে দুটি ওষুধ এনে প্রকাশ্যে পরীক্ষা করা হয়েছে সেগুলো মানসম্মত বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা। আরও দুই ধাপ পরীক্ষার পর সব বিবেচনায় উত্তীর্ণ হলে এ দুটি ওষুধ আমদানি করে এডিসসহ সব ধরনের মশা নিধনে মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করা হবে।
দেশে অব্যাহত হারে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় সম্প্রতি কার্যকর ওষুধ সংগ্রহে আদেশ দেন উচ্চ আদালত। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়গুলোর জটিলতা দূর করে দ্রুত বিদেশ থেকে মশা নিধনের কার্যকর ওষুধ আনতে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জানা গেছে, গত ২৮ জুলাই মশার ওষুধ সংগ্রহ নিয়ে বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আবুল কালাম আজাদ, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং স্বাস্থ্যসেবা অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কীটনাশক বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী নতুন চারটি ওষুধ কেনার সিদ্ধান্ত হয় বলে জানিয়েছে ডিএসসিসির ভাণ্ডার বিভাগ। ওই ওষুধগুলো হচ্ছে−ম্যালাথিউন ৫৭% ইসি (Malathion 57% EC), ম্যালাথিউন ৫% আরএফইউ (Malathion 5% RFU), ডেল্টামেথ্রিন + পিআরও -2% ইডব্লিউ (Deltamethrin+PRO -2% EW), প্রিমিফোস-মিথাইল ৫০% ইসি (Pirimiphos-Methyl 50% EC)।
তবে এই ওষুধগুলোর মধ্যে বিপিএল লিমিটেড কোম্পানির ‘ম্যালাথিউন ৫৭% ইসি’ কীটনাশকটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বাতিল করেছে। পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলায় ২০০৭ সালের দিকে এর রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে সংস্থাটি। এর সিরিয়াল নং এপি-৬৮। এর আগে ২০০৩ সালের দিকে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন মশা নিধনে এই ওষুধটি ব্যবহার করতো। কিন্তু বাতিল হওয়া এই ওষুধটিও কেনার প্রস্তাব করা হয় ওই বৈঠকে। বাংলাদেশে বাকি ওষুধগুলোর রেজিস্ট্রেশন নেই। এর মধ্যে অনলাইন ঘেঁটে জানা যায়, তালিকায় থাকা একটি ওষুধ মানসম্মত না হওয়ায় সেটি প্রত্যাহার করে নেয় থাইল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশ। বিষয়টি নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দেশে আনা হচ্ছে ‘নিষিদ্ধ’ ওষুধ!’ শিরোনামে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর মশার ওষুধের এই তালিকাটি আবারও সমালোচিত হয়। তবে এর দায় নিতে রাজি হয়নি আণবিক শক্তি কমিশনের বৈঠকে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞদের কমিটি।
ওই কমিটির সদস্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি তো ওই কমিটির একজন সদস্য। কিন্তু চারটি ওষুধের নাম কে দিয়েছে? কমিটির আলোচনায় তো কোনও ওষুধের নাম বলা হয়নি। বলা হয়েছে, ৪-৫টি ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি করে পরীক্ষার পর রেজিস্ট্রেশন দিতে হবে। যাতে কেউ একচেটিয়া ব্যবসা বা অতিরিক্ত দাম না দিতে পারে। আর একটা ওষুধের বিকল্প ওষুধও পাওয়া যায়।’
তবে ডিএসসিসির ভাণ্ডার বিভাগ থেকে এই ওষুধগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে বলে একটি সূত্র দাবি করেছে। তখন এই ওষুধগুলোর নাম উচ্চ আদালতকেও অবহিত করা হয়।
তবে ডিএসসিসির একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ওষুধটিসহ প্রিমিফোস-মিথাইল ৫০% ইসি (Pirimiphos-Methyl 50% EC) ওষুধটি থাইল্যান্ড সরকার ফ্রিজআউট (প্রত্যাহার) করেছে। কিন্তু তাদের কেনার তালিকায় এই ওষুধ দু’টিও ছিল। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে ডিএসসিসি। এ চারটি ওষুধের মধ্যে ভারতীয় কোম্পানি টেগ্রোস কেমিক্যাল ইন্ডিয়া লিমিটেডের তৈরি ম্যালাথিউন ৫% আরএফইউ ও ডেল্টামেথ্রিন ১১.২৫% ইএলভি (Deltamethrin+PRO -2% EW এর একটি অংশ) আমদানি করা হয়। বিতর্কিত ওষুধগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে ডিএসসিসি’র সহকারী ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা লিয়াকত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চারটি ওষুধের মধ্যে দুটি ওষুধ আনা হয়েছে। কয়েকটি ওষুধ নিয়ে বিভিন্ন কথাবার্তা উঠেছে। যে ওষুধগুলো এসেছে সেগুলো প্রাথমিক পরীক্ষায় আমরা ভালো দেখতে পেয়েছি। বাকি পরীক্ষার পর বিস্তারিত বলা যাবে। এর বেশি বলা যাবে না।
তবে এ নিয়ে মঙ্গলবার কোনও কথা বলতে রাজি হননি সংস্থাটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. শরীফ আহমেদ। অবশ্য তিনি এর আগে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, ‘যে চারটি ওষুধের নাম এসেছে তার মধ্যে দুটি ওষুধই থাইল্যান্ডে ফ্রিজআউট করা হয়েছে। থাইল্যান্ড থেকে এ খবর তারা পেয়েছেন। থাইল্যান্ড থেকে যে ওষুধ ফ্রিজআউজ করা হয়েছে সেটা বাংলাদেশে ব্যবহার করা যাবে না। থাইল্যান্ডে ডেঙ্গুর অবস্থা বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সভায় বিদেশ থেকে সরাসরি দ্রুত সময়ে কীটনাশক আমদানির জন্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নামে রেজিস্ট্রেশন করার সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী ২৯ জুলাই উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং, খামারবাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করা হয়। প্রত্যাশিত কীটনাশক আমদানির ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এই ওষুধগুলো আমদানির ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কীটনাশকের নমুনা বিদেশ থেকে ৩১ জুলাই পৌঁছাবে (যদিও সেটি পৌঁছে ৫ আগস্ট)। নমুনা পাওয়ার পর মহাখালীর আইইডিসিআরে (রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান) কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য পাঠাতে হবে। পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর দুই সিটি করপোরেশন রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করবে। রেজিস্ট্রেশন সম্পাদনের পরপরই কীটনাশক আমদানির জন্য এলসি খোলা হবে। রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান এলসি পাওয়ার পর কীটনাশক উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করবে। উৎপাদিত কীটনাশক কার্গো বিমানে নিকটবর্তী শিডিউল অনুযায়ী বাংলাদেশে আনা হবে। প্রত্যাশিত কীটনাশক কাস্টমস ক্লিয়ারিং শেষে সিটি করপোরেশনের হাতে পৌঁছাবে। এ কীটনাশক নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশ্রণ শেষে ব্যবহার করতে হবে।