মেয়েকে জানান তিনি−ছাদে গোলাপ ফুটেছে, গোলাপের রঙ গোলাপি, পাতার রঙ সবুজ, গন্ধরাজ ফুলের রঙ সাদা আর মাথার ওপরের আকাশের রঙ নীল। কিন্তু মেয়ে জান্নাত যখন বলে, ‘মা, আমি তো আকাশই দেখি না। তাহলে আকাশি রঙ চিনবো কী করে?’ তখন মায়ের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। কিন্তু জান্নাত সেটাও জানতে পারে না। মায়ের চোখে যে জল, তা কী করে জানবে কন্যা−সেই ছোট বেলায় চোখের কর্নিয়াতে আঘাত পেয়ে দৃষ্টিশক্তিই যে হারিয়েছে সে। তার দু’চোখজুড়ে অন্ধকার।
মাফরুহা ইসলামের মতো অনেক মায়ের চোখেই এমন জল। হাহাকারে দিনে কাটাচ্ছে হাজারও পরিবার। কেউ একটি চোখ দান করলেই যেন কেটে যাবে তাদের ওপর নেমে আসা এই নিকষ আঁধার। অথচ সেটা কতো দুষ্প্রাপ্য! এর একমাত্র সমাধান মরণোত্তর চক্ষুদান। কিন্তু সচেতনতার অভাবে এটি এখনও খুব প্রচলিত হয়ে ওঠেনি।
তবে এখন মরণোত্তর চক্ষুদান নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির ব্যাপারে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন অনেকে। তারা মনে করছেন, একজন মৃত মানুষের চোখের কর্নিয়া যদি আরেকজন মানুষের চোখের অন্ধকার দূর করে তাহলে তার চেয়ে সুন্দর কিছু হতে পারে না। মরে যাওয়ার পর মানুষ যদি তার চোখের আলো দান করে যেতে আগ্রহী হন, তাহলে আলো ফুটবে আরও হাজারও চোখে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, বিশ্বে দৃষ্টিহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার ৫ কোটি এবং বাংলাদেশে এই সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। এছাড়া দেশে প্রতিবছর নতুন করে দৃষ্টি হারাচ্ছেন গড়ে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। তাদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৫ লাখ ২৬ হাজার শুধু কর্নিয়াজনিত কারণে দৃষ্টিহীন।
এই মানুষদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেওয়ার একমাত্র উপায় হলো চোখের কর্নিয়া প্রতিস্থাপন। এক্ষেত্রে কাজ করছে সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি। তারা জানায়, বছরে গড়ে ৬০ থেকে ৬৫টি কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করছে এই সংস্থা। একটি কর্নিয়ার জন্য প্রতিবছর অপেক্ষা করেন ৭০ জন মানুষ। আগামী ১০ বছরের মধ্যে দেশ থেকে কর্নিয়াজনিত অন্ধত্ব দূর করতে প্রতিবছর ৩৬ হাজার কর্নিয়া সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
সন্ধানী থেকে আরও জানা যায়, ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. আহমেদ শরীফ, সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক হাসনা বেগম, বিশিষ্ট সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ, ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন, বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ এইচ সাইদুর রহমান, সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির সাবেক মহাসচিব ডা. বাবুল চন্দ্র দে শিশিরসহ অনেকেই মরণোত্তর চক্ষুদান করেছেন। তাদের কর্নিয়া নিয়ে দৃষ্টি ফিরে পেয়েছেন অনেক দৃষ্টিহীন।
সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক সভাপতি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আলী আসগর মোড়ল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর, সাংবাদিক ও লেখক কামাল লোহানী, নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের ও সারা যাকের, ম হামিদ, হাসান ইমাম ও লায়লা হাসান, সাবেক সেনাপ্রধান লে. জে. এম. হারুন-অর-রশীদসহ অনেকেই মরণোত্তর চক্ষুদানের অঙ্গীকার করেছেন।
১৯৮৪ সালে সন্ধানীর যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে ইতোমধ্যে চক্ষুদান করার অঙ্গীকার করেছেন এমন ৩৫ হাজার মানুষের একটি তালিকাও রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের ঠিকানাসহ সবকিছু আমাদের কাছে আছে। তবে সমস্যা হচ্ছে, ওই ব্যক্তিরা মারা যাওয়ার পর মৃত্যুর খবর আমাদের কাছে আসে না। আরেকটি সমস্যা হয়, পরিবারের সদস্যরা কাজটি করতে দিতে রাজি হন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আবার অনেকেই দেশের বাইরে মারা যান, তার চোখ আর পাওয়া যায় না।’ এ ব্যাপারে সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। এক্ষেত্রে মারা যাওয়ার ছয় ঘণ্টার মধ্যে কর্নিয়া সংগ্রহ করলে ভালো ফল পাওয়ার বিষয়টিও বিবেচ্য বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বিএসএমএমইউ-এর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বলেন, ‘‘মানুষের কাছে এই বার্তা দিতে হবে যে সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি চোখ সংগ্রহ করে। তাদের ‘আই ব্যাংকে’ সেটা ‘প্রিজার্ভ’ করার ব্যবস্থা রয়েছে। আবার কেউ যদি সন্ধানীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাহলে তারা নিজেরাই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চোখ সংগ্রহ করে।’’
কর্নিয়াজনিত অন্ধত্বের শিকার যারা, তাদেরও একটি তালিকা সন্ধানীর কাছে রয়েছে বলে জানান সংস্থাটির বর্তমান সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. একেএম সালেক।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এখন মূল কাজ মোটিভেশন করা, এজন্য সমাজের সর্বস্তরের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মিডিয়া যেমন প্রচার করে ‘রক্ত দিন, জীবন বাঁচান’। তেমনি ‘মরণোত্তর চক্ষুদানে আরেকজন দেখবে পৃথিবী’ এটা যদি তারা প্রচার করে, তাহলে জনসচেতনতা তৈরি হবে।’’