কতদিন টিকে থাকবে সাধুরীতি?

সাধু-চলিত শব্দ (ছবি: সংগৃহীত)বর্তমানে দৈনন্দিন কাজকর্ম বা সাহিত্য রচনায় বাংলা ভাষার সাধু রীতির প্রয়োগ নেই বললেই চলে। কেবল আইন-আদালত ও সরকারি দফতরে দেখা যায় ভাষার এ রীতির ব্যবহার। এর বাইরে পাঠ্য বইয়ে স্থান পাওয়া গদ্য সাহিত্যের যেগুলো সাধুরীতিতে রচিত সেটাই শেখানো হয়। এছাড়া অন্য কোথাও সাধুরীতির ব্যবহার হয়ই না। ফলে ভাষায় এই রীতির ব্যবহার একেবারেই গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। ভাষাবিদরা এই রীতির উপযোগিতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাধুরীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও।

সাধু রীতিতে রচিত সাহিত্যই বাংলা সাহিত্যের রত্নভাণ্ডার বলা হলেও এ সাহিত্য সাধারণ মানুষের মন জয় করতে পারেনি। বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গত এক শতকে বাংলা ভাষা সাধুরীতি থেকে চলিত রীতিতে চলে এসেছে। এর সূত্রপাত করেন মূলত প্রমথ চৌধুরী। তার সম্পাদিত সবুজপত্র পত্রিকায় তিনি মাঠের বা কথ্য ভাষার চলিত রীতির লিখিত প্রয়োগ শুরু করেন। অবশ্য এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এসময় রবীন্দ্রনাথ নিজেও সাধুরীতিতে গদ্য রচনা করলেও সেটাকে সহজবোধ্য করে চলিত রীতির কাছাকাছি নিয়ে যান। এর ধারাবাহিকতায় বিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে সাধু রীতির ব্যবহার ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং জায়গা দখল করে চলিত রীতি। এক সময় দুই বঙ্গের পত্রপত্রিকাগুলো সাধুরীতিতে প্রকাশ হলেও এখন তা নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে-পরে সব গণমাধ্যমগুলো সাধুরীতি ত্যাগ করে চলিত রীতি গ্রহণ করতে থাকে। এক্ষেত্রে অধুনালুপ্ত আজকের কাগজ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। চলিত ভাষারীতির প্রয়োগের পাশাপাশি সংবাদপত্রের খোলনলচে পাল্টে দিয়ে নতুন ধারার বিস্ফোরণ ঘটায়। মূলত আজকের কাগজকেই বলা হয় বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক সংবাদপত্র যার ধারা এখন প্রায় সব কাগজে অব্যাহত। সে আবহের সঙ্গে মিশতে সময় নিয়েছিল দেশের অন্যতম প্রাচীন পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাক ও সংবাদ। তবে সংবাদ দ্রুতই নিজেদের পাল্টে নিতে শুরু করলেও ইত্তেফাককে চলতি ভাষা আয়ত্তে নিতে সামাল দিতে হয়েছিল অভ্যন্তরীণ সমস্যাও। পুরনো রীতিতে কাজ করা সাংবাদিক ও মুদ্রণকর্মীদের চাপে একই পত্রিকায় কয়েক পাতা সাধু রীতিতে ও কয়েক পাতা চলতি রীতিতে দীর্ঘদিন ছাপতে বাধ্য হয়েছিল ঐতিহ্যবাহী পত্রিকাটি। এরপর পাতার সমস্যা কাটালেও সাধু ভাষায় সম্পাদকীয় লেখার চল এখনও অব্যাহত রেখেছে দৈনিক ইত্তেফাক।

এদিকে সরকারি দফতর ও আইন-আদালত ছাড়া নিত্যদিনের কাজে কর্মে কোথাও সাধুরীতির ব্যবহার বর্তমানে নেই। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দেশের সংবিধান সাধু রীতিতে লেখার কারণে আইন-কানুনও এ রীতিতে রচিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় সরকারি দফতরের চিঠিপত্র, প্রজ্ঞাপন, আদেশ-নির্দেশ জারির ক্ষেত্রে সাধু ভাষার ব্যবহার হয়। তবে, সরকারি নির্দেশনা না থাকলেও অতি সম্প্রতি কিছু কিছু চিঠিপত্রে চলিত ভাষার ব্যবহার চোখে পড়ছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি সুকেন্দ্র কুমার সিনহা যে পদত্যাগ পত্র জমা দিয়েছিলেন সেটা তিনি চলিত রীতিতে লিখেছিলেন।

সাধুরীতির প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিষয়ের অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সাধু বাংলা ভাষার একটি রীতি। কথা বলার সময় আমরা চলিত রীতিতে বলি। কেউ আঞ্চলিক রীতিতে বলি। এক্ষেত্রে আমরা সাধু ভাষা সাধারণত ব্যবহার করি না। লেখার সময়েও সাধু ভাষার ব্যবহার একেবারেই কমে এসেছে। আইন আদালত আর সরকারি দফতরে সাধুভাষা দেখা যায়। আমরা তো এখন সবখানে চলিত ভাষাই ব্যবহার করি। এটাকে আইন করে সর্বক্ষেত্রে প্রচলন করলে কোনও সমস্যা নেই। তবে, সাধু রীতিটা একেবারে হারিয়ে ফেললে বাংলা সাহিত্য তার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলবে। সাধুরীতির গদ্যটা উঠে গেলে নবীন পাঠকদের কাছে ধাক্কা লাগতে পারে। এজন্য আমরা সাধুরীতিটা শেখাই। কিন্তু উপযোগিতার দিক থেকে বলতে হলে বলবো সাধু রীতির ব্যবহার উপযোগিতা অনেকটাই কমে গেছে। ভাষারীতিটা বেঁচে থাকুক সেটাও আমরা চাই। তিনি জানান, আগে পত্রিকাগুলো সাধুভাষায় লেখা হলেও এখন কোনও পত্রিকায় এই ভাষা নেই। শুধুমাত্র ইত্তেফাকে নমুনা হিসেবে সম্পাদকীয়টা সাধু ভাষায় লেখে বলে দেখা যাচ্ছে।

রাজধানীর একটি প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের বাংলা বিষয়ের শিক্ষক জুবাইদা রহমান একাধিকবার বোর্ড পরীক্ষার পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। উত্তরপত্রে সাধুরীতির ব্যবহার প্রশ্নে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা জেনে-বুঝে কেবল আবেদনপত্রটাই সাধু রীতিতে লেখেন। অন্য কোনও প্রশ্নের উত্তর কেউ সাধুরীতিতে লেখে এটা দেখা যায় না। কেউ ভুল করে একই প্রশ্নের উত্তরে দুই রীতির মিশ্রণ ঘটিয়ে থাকে। ইদানিংকালে অনেকের আবেদনপত্রও চলিত রীতিতে দেখা যায় বলেও তিনি জানান।  তার মতে, সিলেবাসভুক্ত পাঠসূচিতে সাধুরীতির গদ্য সাহিত্য শেখার কারণে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার সময় গুলিয়ে ফেলে। এজন্য বাংলা বিষয়ের প্রশ্নপত্রে একই প্রশ্নে সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রণকে দূষণীয় উল্লেখ করা হলেও শিক্ষার্থীরা অনেক সময় ভুল করে মিশ্রণ ঘটিয়ে থাকে।

বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক বিশিষ্ট গবেষক শামসুজ্জামান খান বলেন, সাধুরীতি বাদ দেওয়া বা টিকিয়ে রাখার কোনও বিষয় নয়। এটা বাংলা ভাষায় ঐতিহাসিকভাবে এসেছে। বিবর্তনের মাধ্যমে এটা এখন গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। বিবর্তনের মাধ্যমে এর পরিণতি যা-ই হবে তা আমাদের মেনে নিতে হবে।

তিনি বলেন, ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের ইচ্ছায় এটা ধরে রাখা বা বাদ দেওয়া যাবে না। কেউ যদি সাধুভাষায় শক্তিশালীভাবে লিখতে পারেন তাকে সেই স্বাধীনতা দিতে হবে। কারও স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া যাবে না।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সাধুরীতি হয়তো আইন-কানুন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বাইরে কোথাও আর থাকবে না। আমাদের সংবিধান যেহেতু সাধুরীতিতে রচিত সেইজন্য এটাকে ঘিরে আইন-আদালত ও সরকারি দফতরে সাধুরীতির প্রচলন এখনও রয়েছে। এর সূত্র ধরে নতুন আইনগুলোও সাধুরীতিতে তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে সংবিধান যদি চলিত ভাষায় লেখার আবশ্যকতা সৃষ্টি হয় তখন তাকে ঘিরে সৃষ্ট আইন-আদালতের ভাষাতেও পরিবর্তন আসবে।