দেশে করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির অন্যতম সদস্য, শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম এবং আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুস্তাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় এ তথ্য জানান।
সংসদের চলতি বাজেট অধিবেশনে অংশ নিয়েছেন এমন দুই জন সংসদ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। গত ১৫ জুন সম্পূরক বাজেট পাসের দিন বৈঠকে অংশ নেওয়া বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির ১৭ জুন করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। ১৫ জুন অধিবেশনে যোগদান ছাড়াও ১১ জুন সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকেও যোগ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। আরও ১০ জনের মতো মন্ত্রী এবং প্রায় সমান সংখ্যক সচিব মন্ত্রিসভার ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া, গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয় ১৬ জুন। তিনি করোনার উপসর্গ নিয়ে ১৫ জুন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি গত ১০ জুন চলতি অধিবেশন শুরুর দিন সংসদের বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন।
সংসদের বৈঠকে অংশ নেওয়া দুই এমপির করোনা পজিটিভ হওয়ায় অনেক সংসদ সদস্য এবং সংসদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সংসদের বৈঠকে অংশ নেওয়া এই দুই জন সংসদ সদস্য ছাড়াও সংসদ সচিবালয়ের ৯১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর করোনা পজিটিভ পাওয়া গেছে। এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী অধিবেশন কক্ষসহ সংসদ সচিবালয়ের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। আক্রান্তদের কেউ কেউ রয়েছেন, যাদের স্বাভাবিক সময়ে দায়িত্ব পালনের স্বার্থে সংসদের ভিআইপি এবং ভিভিআইপিদের সংস্পর্শে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে।
দেশে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সংসদের চলতি অধিবেশনে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অধিবেশন কক্ষে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার জন্য সাময়িক আসন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের একজন থেকে অপরজনকে অন্তত এক মিটার দূরে বসতে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এটি নিশ্চিত করতে অধিবেশনের দিন এমপিদের উপস্থিতি ৬০ থেকে ৮০ জনের মধ্যে সীমিত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংসদের বৈঠকে অংশগ্রহণকারী সব এমপির মাস্ক পরার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনও সংসদ সদস্য যেন মাস্ক না খোলেন হুইপরা তা নিয়মিত মনিটর করছেন। এছাড়া সংসদ ভবনে প্রবেশের সময় তাপমাত্রা পরিমাপসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে।
এদিকে সরকারের মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য, কয়েকজন সংসদ সদস্য ও সংসদ সচিবালয় কর্মকর্তাদের করোনা পজিটিভ হওয়া এবং দেশে করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার প্রেক্ষাপটে সংসদের অধিবেশনে কাটছাঁট করা হয়। পূর্ব পরিকল্পিত কার্যদিবসের তুলনায় অধিবেশনের মেয়াদ তিন থেকে চার দিন কমানো হয়েছে। কমানো হয়েছে বাজেট অধিবেশনে আলোচনার সময়ও।
করোনা আক্রান্ত দুই এমপি অধিবেশনে যোগ দেওয়ায় এবং বৈঠকে থাকায় অন্য এমপিদের সংক্রমিত করবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা যতদূর জানি, অধিবেশন কক্ষে বসার জন্য ডিসট্যান্স মেনটেইন করা হয়েছে। অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধিও মেনে চলা হচ্ছে। আর এটা নিশ্চিত হলে আক্রান্ত এমপিদের মাধ্যমে অন্যদের সংক্রমণের সম্ভাবনা কম।’
বায়ুনিয়ন্ত্রিত সংসদ কক্ষ সংক্রমণ ছড়ানোর কারণ হতে পারে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা ব্যাখ্যা করে বলা কঠিন। তবে সংসদ সদস্যরা যদি মাস্ক ব্যবহার করে থাকেন, সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে থাকেন, ডিসট্যান্স মেনটেইন করেন— তাহলে সংক্রমণ হওয়ার কথা নয়।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুস্তাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আক্রান্ত কোনও ব্যক্তির এক মিটারের কাছাকাছি যদি কেউ অন্তত ১৫ মিনিট অবস্থান করেন, তাহলে তিনি কন্ট্রাক্ট বা সংস্পর্শ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হবেন এবং তাকে কোয়ারেন্টিন করতে হবে। আর এক মিটারের বাইরে যদি কেউ থাকেন, তাহলে তাকে কোয়ারেন্টিন করতে হবে না।’
তিনি বলেন, ‘আক্রান্ত ওই সংসদ সদস্যের লক্ষণ দেখা দেওয়ার দুই দিন আগে থেকে এবং লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর ১৫ দিন পর্যন্ত তার সংস্পর্শে কেউ যদি ১৫ মিনিট বা তার বেশি সময় থেকে থাকেন, তবে তাদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকবে। আর ওই সময়টাতে এক মিটার দূরত্বের মধ্যে কেউ অবস্থান না করলে, তাদের ক্ষেত্রে আশঙ্কা থাকার কথা নয়।’
কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অধিবেশন কক্ষ এক্ষেত্রে ঝুঁকির কারণ কিনা প্রশ্নে এই চিকিৎসা বিজ্ঞানী বলেন, ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুম ছোট হলে সেটা ঝুঁকির বিষয় হতে পারে এবং সেটাও হবে এক মিটারের মধ্যে অবস্থানের কারণে। কিন্তু সংসদের অধিবেশন কক্ষ খুবই প্রশস্ত আর এয়ারকন্ডিশনের বাতাস সরাসরি সংসদ সদস্যদের গায়ে লাগে না। উনারা কেবল সেটা অনুভব করেন। ফলে এক্ষেত্রে এখানে ঝুঁকি কম।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যতদূর জেনেছি অন্য সংসদ সদস্যরা মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। ধারণা করছি, অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের আগে তারা সাবান দিয়ে হাত ধুয়েছেন। বের হওয়ার পরও একই কাজ করেছেন। আর এসব করে থাকলে তাদের ঝুঁকি কম থাকার কথা।’
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকি এড়াতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো সংসদ সদস্যদেরও একযোগে নমুনা পরীক্ষা করানো হলে তা ভালো হতো বলে মন্তব্য করেন ডা. মুস্তাক হোসেন।
সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব জাফর আহমেদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন তো আপনার আমার সবার জন্যই ঝুঁকি রয়েছে। আমরা যথাসম্ভব কেয়ারফুলি অধিবেশন চালানোর চেষ্টা করছি। সংসদ সদস্যদের সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে আসন ব্যবস্থাসহ শুরু থেকে সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করার চেষ্টা করছি।’