দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে নানা উদ্যোগ, বঙ্গবন্ধুর উদ্বেগ

1(বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকারি কর্মকাণ্ড ও তার শাসনামল নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে বাংলা ট্রিবিউন। আজ পড়ুন ওই বছরের ১৯ আগস্টের ঘটনা।)
১৯৭২ সালের ১৯ আগস্ট। সদ্য স্বাধীন দেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতি আবারও ঘুরে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা করছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শিল্পকারখানা জাতীয়করণ, মজুতদারদের বিরুদ্ধে মামলা, ব্যাপকভাবে খাদ্যসামগ্রী বিলি-বণ্টন থেকে শুরু করে বিপদ এড়াতে অত্যন্ত জরুরি দরকারের এলাকায় বিমান থেকে খাদ্য বিতরণের মতো উদ্যোগ চলছিল। একইসঙ্গে দেশ তখন মোকাবিলা করছে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সব মিলিয়ে আগস্টে এসে আরও ভঙ্গুর পরিস্থিতি তৈরি হয়। সে সময় বঙ্গবন্ধু চিকিৎসা নিতে লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। সেখানে হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে হোটেল কক্ষে তিনি দফায় দফায় বৈঠক করে দেশের পরিস্থিতির বিষয়ে খোঁজ রাখছিলেন।
এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গত কয়েকদিন বেশ ভালো আছেন বলে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের এক স্বাস্থ্য বুলেটিনে প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়, বঙ্গবন্ধুর শরীর এখনও দুর্বল এবং তার কাজকর্ম সীমিত রাখা হয়েছে। খবরে বলা হয়, সেদিন বিকালে তিনি কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করেছেন। সে সময় জনতা ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর খাইরুল কবীরও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। লন্ডনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটিশ সরকার এবং ক্লিনিক ও চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত কর্মচারীদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

বিশ্বব্যাংক প্রধানের অভিনন্দন

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ম্যাকনামারা প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট প্রেরিত এক বাণীতে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিতে স্বাগত জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও উন্নয়ন সংস্থার সদস্যপদ পায়।

2

বাস্তবভিত্তিক প্রচেষ্টার কথা বললেন রাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাঈদ চৌধুরী নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং দেশের গণভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে সর্বাত্মক সুসংগঠিত প্রচেষ্টা শুরু করার আহ্বান জানান। এইদিনে সপ্তাহব্যাপী শিক্ষা সেমিনার উদ্বোধনকালে প্রেসিডেন্ট দেশবাসীর উদ্দেশে এ আহ্বান জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, বাংলাদেশ থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য বাস্তবভিত্তিক সংকল্পবদ্ধ এবং যৌথ প্রচেষ্টা দরকার। একটি ব্যাপক গণশিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার আলোকবর্তিকা সাধারণ মানুষের দরজায় পৌঁছে দিতে হবে।

3

খাদ্যের অগ্নিমূল্য কমাও

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির অগ্নিমূল্যে সাধারণ মানুষের জন্য প্রাণান্তকর অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল ১৯৭২ সালের আগস্টে। শহর, বন্দর ও গঞ্জের নিম্ন ও স্বল্প আয়ের সংসারের জীবন ধারণের প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রকট হয়ে দেখা দেয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল হতে উদ্বেগজনক খবর পাওয়া যাচ্ছিল। এমন খবর পাওয়া যায় যে একই বস্ত্র জোড়াতালি দিয়ে মা মেয়ে পরার ব্যবস্থা করছে। প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়, গ্রামের সাধারণ মানুষের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ বস্ত্রহীন অবস্থায় ছিল। কারাগারে কয়েদিরা প্রায় অর্ধ উলঙ্গ, হাসপাতাল রোগীদের পুরনো ব্যবহার করা চাদর, কম্বল দিয়ে প্রয়োজন মেটানো হচ্ছিল । এরইমধ্যে সুখবরের আভাস দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। তিনি বলেন, আগামী জানুয়ারি মাসে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিদেশ থেকে আমদানির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এনাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির চাপের সৃষ্টি হয়েছে, কাগজি মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি তার কারণ নয়। এর পেছনে নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য কারণ বিদ্যমান। বর্তমান ঊর্ধ্বগতির পেছনে যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, অবৈধ অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা এবং সীমান্তে চোরাচালান জড়িত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে খাদ্য পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য এখন থেকে একদিন অন্তর বৈঠক করার সিদ্ধান্তের কথা জানায় মন্ত্রিসভার খাদ্য ও  নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সংক্রান্ত উপ-পরিষদ। মুখপাত্র জানান, প্রয়োজন হলে পরিষদের বৈঠক রোজ অনুষ্ঠিত হবে। কোনও এলাকায় বিমান থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি নিক্ষেপের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন কিনা উপ-পরিষদ তাও বিবেচনা করবে। বার্তা সংস্থা বাসস এ খবর জানায়।