গত ৩০ জুলাই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে এক সপ্তাহের মধ্যে নগরীর অবৈধ, দৃষ্টিকটু ও ঝুঁকিপূর্ণ ক্যাবল অপসারণ করার ঘোষণা দেন মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। মেয়রের এমন ঘোষণার পর গত ৫ আগস্ট থেকে নগরজুড়ে এসব ক্যাবলের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে ডিএসসিসি। একই ভাবে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) থেকে এই অভিযান শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম।
অভিযান শুরুর পর গত ৫৫ দিনে কয়েক লাখ সংযোগ করেছে দক্ষিণ সিটির ভ্রাম্যমাণ আদালত। এতে চরম বিপাকে পড়তে হয়েছে সাধারণ গ্রাহকদের। ইন্টারনেট ও ডিস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি অনেক টাকার ক্যাবলও নষ্ট হচ্ছে। তারা জানিয়েছেন, নগরীর কোনও ক্যাবলই ক্যাবল অপারেটর কোম্পানিগুলোর নয়। করপোরেশন যেসব সুযোগ কাটছে সেই ক্যাবলগুলো গ্রাহকদের কেনা। ফলে অপারেটর কোম্পানি নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গ্রাহক।
ক্যাবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬ এর ২৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী ‘সেবাপ্রদানকারী কেবল সংযোগের কাজে কোনও সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার স্থানীয় কার্যালয়ের লিখিত অনুমোদন ব্যতীত কোন স্থাপনা ব্যবহার বা সুবিধা গ্রহণ করিতে পারিবে না। আইনের উপ-ধারা ২৮ (২) অনুসারে, যদি কোনও ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোনও অপরাধ করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক এক লাখ টাকা কিন্তু অন্যূন ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং অপরাধ পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে তিনি অনধিক তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।’ এই আইনের ভিত্তিতে ক্যাবলের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে সিটি করপোরেশন।
ক্যাবল অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (কোয়াব) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এস এম আনোয়ার পারভেজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা ডিএনসিসির সঙ্গে বসেছি। তারা সরেজমিন তদন্ত করে দেখেছে। তার কাটলে গ্রাহকরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেসব এলাকায় নতুন ড্রেন করা হচ্ছে সেখানে আন্ডারপাসও করা হচ্ছে। এই সুযোগটা ডিএনসিসি দিচ্ছে। সত্যিকার অর্থে যেখানে অবকাঠামো রেডি নেই সেখানে এটা তো করা যায় না। আমাদের দাবি দুই সিটি করপোরেশন সব সব কোম্পানির সমন্বয়ে একটা জরিপ কমিটি করুক। এর পর পরিকল্পনা অনুযায়ী তার কাটা হোক। যদি সমন্বয় করে এটা করা যায় তাহলে সমস্যা সমাধান হবে। তবে ঢাকার প্রেক্ষাপটে শতভাগ ক্যাবল মাটির নিচে নেওয়া সম্ভব না। আন্ডারগ্রাউন্ড কোম্পানিগুলো সরকারকে সম্পূর্ণ মিসগাইড করছে। তারা যা বলছে আসলে তাদের কথা এবং কাজের মিল নেই।
বাংলাদেশ ইন্টারনেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন আনু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আন্ডার গ্রাউন্ড ক্যাবলের জন্য যে দুটি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারা চাহিদার ১০ শতাংশও সার্ভিস দিতে পারেনি। তাদের সক্ষমতা খুবই কম। তাছাড়া দেড় থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে আন্ডারগ্রাউন্ড লাইনের ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্ট রাখা হয়েছে। সেখান থেকে সংযোগ নিয়ে যখন প্রতিটি বাড়িতে দেওয়া হয়, তখন তো আবারও সেটি মাটির ওপরের বৈদ্যুতিক পোল বা অন্যান্য সংযোগের মধ্যে চলে যাচ্ছে। যদি ক্যাবলকে ঝুলন্ত মুক্ত রাখতে হয় তাহলে প্রতিটি বাসা-বাড়ির সামনে অথবা দুটি বাড়ির জন্য একটি ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্ট রাখতে হবে। তাহলে আর কোনও বৈদ্যুতিক পোলের ওপর নির্ভর হতে হবে না। কিন্তু যারা এই দায়িত্বটি নিয়েছেন, তারা সেটি করতে পারেনি।’
সিটি করপোরেশন যে অভিযান করছে তাতে কোম্পানিগুলোর চেয়ে গ্রাহকরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আর এ কারণে তারা প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারক লিপি প্রদানের পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলনেরও চিন্তাভাবনা করছেন বলে জানান এই ইন্টারনেট ব্যবসায়ী।
ফুলবাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা নাজিম উদ্দিন বলেন, কোনও নোটি ছাড়াই সিটি করপোরেশন এসে আমাদের ইন্টারনেট ও ডিসের ক্যাবল কেটে দিয়েছে। তারা বলছে এটা নাকি অবৈধ। রাস্তার নিচে নিতে হবে। তাহলে মাটির নিচে লাইন করে দেওয়ার দায়িত্ব কার? যদি মাটির নিচে লাইন থাকে সেখান থেকে সংযোগ দেওয়ার দায়িত্ব কার? নিশ্চয় সরকার, সিটি করপোরেশন বা ক্যাবল অপারেটর কোম্পানিগুলোর। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে তো কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ব্যবস্থা তো আমরা যারা গ্রাহক তাদের বিরুদ্ধেই হচ্ছে। অপরাধ তাদের, আর ভুক্তভোগী আমরা।
ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, হঠাৎ করেই এক দিন সিটি করপোরেশনের লোকজন এসে এলাকার সব ক্যাবল কেটে দিয়ে গেছে। করোনাকালে বাসায় বসেই অফিস করতে হচ্ছে। বাচ্চাদের পড়াশোনাও হচ্ছে ইন্টারনেটে। কিন্তু লাইন কেটে দেওয়ার কারণে অফিস করতে পারিনি। বাচ্চাদের পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটেছে।
কোম্পনিগুলোর দায় গ্রাহকরা নেবে কেন এমন বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সিটি করপোরেশন ভূমি বা অন্য কিছু ব্যবহার করতে হলে আইন অনুযায়ী করপোরেশনের অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু তারা নেয়নি। যারা লাইন বা সংযোগ নিচ্ছে তারা ওই কোম্পানির সঙ্গে কথা বলুক। এতে আমাদের করার কিছুই নেই। আমাদের অভিযান চলবে।
যেহেতু অধিকাংশ এলাকায় আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যবস্থা নেই সেহেতু সেসব এলাকায় ভূমি বা ল্যাম্প পোস্ট ব্যবহারের জন্য অনুমতি চাইলে সিটি করপোরেশন সে অনুমতি দেবে কিনা এমন প্রশ্ন করা হলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।
উত্তর সিটির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ক্যাবল কাটা যাচ্ছে গ্রাহকের এটা সত্য। দায় কিন্তু কোম্পানিগুলোর। এই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি)। কিন্তু আমি কোনও ঝুলন্ত তার রাখবো না। আমি তাদেরকে বলে দিয়েছি তাদেরকে বিকল্প পথ তৈরি করে দিয়েছি। তারা সেখানে তার স্থানান্তর করবে। যেসব স্থানে তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে লাইন নিবে সেখানে আমরা ওপরের ঝুলন্ত তার কাটবো।
তিনি আরও বলেন, আমি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ৭ দফায় মিটিং করেছি। সেখাবে সব কোম্পানি ছিল। তারা আমার সঙ্গে একমত হয়েছে। আমি বলেছি, আপনাদের (কোম্পানি) দিয়েই তার কাটবো। আমি চাই না একবার তার কেটে দেবো আবার তারা ঝুলিয়ে দেবে। বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই আমি তার কাটছি। এতে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।