বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের মহাসচিব কুট ওয়ার্ল্ডহেইমের কাছে পাঠানো এক ব্যক্তিগত তারবার্তায় পাকিস্তানে আটক বাংলাদেশিদের অবস্থার দ্রুত অবনতির জন্য গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং পাকিস্তান থেকে আটক বাঙালিদের দেশে ফিরিয়ে আনা ত্বরান্বিত করার জন্য মহাসচিবের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
১৯৭২ সালের ১৪ অক্টোবর পাঠানো এক ব্যক্তিগত তারবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাসচিবকে পাকিস্তানিদের অমানুষিক নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে বাঁচানোর জন্য এবং সেখানে তাদের অবস্থা সরেজমিনে তদন্ত করে দেখার জন্য পাকিস্তানে তাদের প্রতিনিধি পাঠানোর আবেদন জানান। পাকিস্তানে আটক সামরিক ও বেসামরিক সরকারি কর্মচারী এবং বহু সাধারণ বাঙালির অবস্থার উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু তার ব্যক্তিগত চিঠিতে বলেন, ‘সেখানে আটক বাঙালিদের যে কেবল তাদের জীবিকা অর্জন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তা নয়, বরং তাদের স্বদেশে ফিরে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। অথচ এ সব বাঙালি সম্পূর্ণরূপে নিরাপদ। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধ বা অন্যায় তারা করেননি। কোনও অপরাধ করেননি। রাওয়ালপিন্ডি কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানে আটক অসামরিক ও সামরিক ব্যক্তিদের মতামত দিতে বলেছিলেন— তারা বাংলাদেশ অথবা পাকিস্তান কার অধীনে কাজ করবেন। এ ধরনের মতামত প্রকাশের আহ্বান জানিয়ে পাকিস্তান সুস্পষ্টভাবেই স্বীকার করে নিয়েছে যে, এই ব্যক্তিরা বাংলাদেশের নাগরিক ও বাংলাদেশে ফিরে আসার অধিকার তাদের আছে।’
জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে পাঠানো ব্যক্তিগত এই চিঠিতে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের অবস্থার দ্রুত অবনতিতে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশের জনগণের গভীর উদ্বেগের কথা আমি আপনাকে অবগত করছি এবং সেখানে আটক বাঙালিদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করার জন্য আবেদন জানাচ্ছি।’ সেখানে বাঙালিদের অমানুষিক নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি মহাসচিবের কাছে এই আবেদন জানান।
এ বছর গোড়ার দিকে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি যখন বাংলাদেশে অবস্থানরত অবাঙালিদের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য এসেছিলেন, তখন বাংলাদেশ সরকার অবাঙালিদের সব সুবিধা দিয়েছে উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘পাকিস্তানের অবস্থা সরেজমিনে তদন্ত করার জন্য আপনি যদি একজন প্রতিনিধি পাঠান তাহলে আমি কৃতজ্ঞ থাকবো।’
প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আশ্বাস দেন যে, পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের নাম ভোটার তালিকায় স্থান পাবে। ১৯৭২ সালের এইদিনে আটক বাঙালিদের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার সময় তিনি এ আশ্বাস প্রদান করেন। তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে যে সব বাঙালি পাকিস্তান থেকে ফিরে এসেছে, তাদের নাম ভোটার তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় প্রথম নির্বাচনের উদ্দেশ্যে ভোটার তালিকা প্রণয়ন শুরু হয়েছে।
এদিন (১৪ অক্টোবর, ১৯৭২) গণপরিষদে ছোটখাটো কয়েকটি সংশোধনীসহ বাংলাদেশ গণপরিষদের বিশেষ অধিকার বিধি নীতি গৃহীত হয়। বিশেষ অধিকার বিলটি গৃহীত হওয়ার পর ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত গণপরিষদের অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হয়। ১৯ অক্টোবর পরিষদের অধিবেশন আবারও বসবে এবং অধিবেশনে খসড়া শাসনতন্ত্র বিলটির ওপর আলোচনা শুরু হবে।