করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার জন্য ‘অ্যান্টিজেন’ পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া হলেও ‘অ্যান্টিবডি’ পরীক্ষার অনুমোদন এখনই দিচ্ছে না সরকার। যদিও একাধিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি পরীক্ষার জন্য তাগাদা দিয়েছেন। জাতীয় পরামর্শক কমিটিও একাধিকবার এই পরীক্ষার বিষয়ে সুপারিশ করেছে।
এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, অ্যান্টিজেন টেস্টের কার্যকারিতাসহ সবকিছু দেখে অ্যান্টিবডি টেস্টের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে পরে চিন্তা করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা অ্যান্টিজেন টেস্টের অনুমতি দিলাম, এটা চালু হোক। এর কী অবস্থা হয় সেটা আগে দেখি, তারপর অ্যান্টিবডি টেস্টের সিদ্ধান্তের বিষয়ে ভাববো।’
তবে মানুষ যাতে বেশি উপকার পায়, সেটাই করা হবে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
কোনও ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়ার পর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। করোনার ক্ষেত্রে সেটা হয় রক্তে। রক্তের শ্বেতকণিকায় এক ধরনের পরিবর্তন আসে এবং সেটা করোনা রোগকে প্রতিরোধ করে। এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকেই বলা হয় অ্যান্টিবডি।
র্যাপিড টেস্টের যৌক্তিকতা তুলে ধরে এই টেস্ট কী ধরনের হতে পারে, সে বিষয়ে গত ৭ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠায় স্বাস্থ্য অধিদফতর। এরপর ৯ জুলাই এ বিষয়ে একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করে সেটিও মন্ত্রণালয়ে পাঠায় অধিদফতর। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ জুলাই অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলীকে প্রধান করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ‘কোভিড-১৯ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা সম্প্রসারণ নীতিমালা’ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটি করে। এরপর খসড়া নীতিমালাটি কমিটির মতামতের জন্য পাঠায় এবং তাদের মতামতের জন্য ১০ কার্যদিবস ঠিক করে দেয়।
বিশেষজ্ঞ কমিটি গত ৪ আগস্ট তাদের মতামত মন্ত্রণালয়ে পাঠায় এবং তারা এ বিষয়ে প্রেজেন্টেশন দেয় ১৮ আগস্ট। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে আরও সুবিন্যস্ত ও পরিমার্জিত করে দিতে বলা হলে সেটি গত ২৩ আগস্ট জমা দেওয়া হয়। পরে ৩১ আগস্ট মন্ত্রণালয় আবারও স্বাস্থ্য অধিদফতরে পাঠায়। এদিকে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরও তাদের এ সংক্রান্ত কাজ শেষ করেছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর সে অনুযায়ী অ্যান্টিবডি-অ্যান্টিজেন কিট কেনার জন্য স্পেসিফিকেশন দেবে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পামর্শক কমিটিও তাদের সভায় অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি টেস্টের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। কমিটি তাদের সভা শেষে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, বর্তমানে পিসিআর টেস্টের মাধ্যমে কোভিড-১৯ পরীক্ষা করা হচ্ছে, যার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। কোভিড-১৯ পরীক্ষার পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারলে কোভিড-১৯ সংক্রমণ আরও বেশি শনাক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য জাতীয় পরামর্শক কমিটি অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি টেস্টের জন্য একাধিকবার পরামর্শ দেয়।
জাতীয় পরামর্শক কমিটি মনে করে, তিন পদ্ধতিতে (পিসিআর, অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি টেস্ট) কোভিড-১৯ পরীক্ষা কার্যক্রম পাশাপাশি থাকলে তা কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এর আগে গত ৩ জুন কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি করোনা শনাক্তে র্যাপিড টেস্টের জন্য সুপারিশ করে। তারা আরটি পিসিআর (রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ পলিমারেজ রিঅ্যাকশন) পরীক্ষার সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করার পক্ষেও মত দেন।
এই কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন সেরোসার্ভিল্যান্স নিয়ে কাজ করার সময় এসে গেছে, যার জন্য অ্যান্টিবডি টেস্ট চালু করাও প্রয়োজন। যেসব কারণে কোভিড-১৯ পরীক্ষা কমে গেছে, সেগুলো দূর করে কোভিড-১৯ পরীক্ষার সংখ্যা আরও বাড়ানো দরকার। এটা করা গেলে বিশ্বমহামারি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সংক্রমণ পরিস্থিতির একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাবে।’
‘সংক্রমণ বুঝতে হলে অ্যান্টিবডি টেস্ট শুরু করা জরুরি। সেরোসার্ভিল্যান্স ছাড়াও অ্যান্টিবডি টেস্টের গুরুত্ব রয়েছে প্লাজমা থেরাপির জন্য’, বলে জানি তিনি।
ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ জানান, যার শরীরে যত বেশি অ্যান্টিবডি থাকবে, তার প্লাজমা দিলে রোগী ভালো ফল পাবে। যদিও অ্যান্টিবডি টেস্ট অ্যান্টিজেন টেস্টের মতো করোনা ডায়াগনসিসের জন্য এখনই জরুরি নয়।
কোভিড-১৯ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা সম্প্রসারণ নীতিমালা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহামারির সময়ে ইনফেকশন কত জনের হয়েছে, সেটা অ্যান্টিবডি টেস্ট ছাড়া বলা যায় না। তাই এ সময়ে অ্যান্টিবডি টেস্ট খুব জরুরি, নয়তো পরিসংখ্যান সঠিক হবে না। আসলে দেশে কত জন সংক্রমিত হয়েছে, আবার কত জনের শরীরে অ্যান্টিবডি গ্রো করেছে, কিন্তু পোস্ট কোভিড সিন্ড্রোমে মারা গেছেন, সেটা জানার জন্য হলেও অ্যান্টিবডি টেস্ট দরকার।’ আবার ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্যও অ্যান্টিবডি টেস্ট শুরু করা দরকার বলে মত দেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বলেন, ‘ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য যাদের তালিকা করা হবে, তাদের মধ্যেও অ্যান্টিবডি টেস্ট করা জরুরি হবে। কারণ, অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গেলে তাদের ভ্যাকসিন দেওয়া অর্থহীন। তবে অত্যন্ত দুর্ভাগ্য যে, এখনও দেশে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা শুরু করা গেলো না। অথচ অ্যান্টিবডি পরীক্ষা ছাড়া ভ্যাকসিন নীতিমালা করা খুব কঠিন হয়ে যাবে।’
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অ্যান্টিজেন টেস্ট করা হবে। কিন্তু অ্যান্টিবডি টেস্ট ডায়াগনসিস করার কাজে ব্যবহার হবে না। তবে কেউ যদি কোনও গবেষণা করতে চায় অ্যান্টিবডি নিয়ে, সেটা করতে পারবেন অনুমতি সাপেক্ষে, অনুমতি নিয়ে করতে হবে।’