সাইফুল ইসলামের স্ত্রী তানিয়া সুলতানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যে কোনও মৃত্যুতে তার পরিবারের প্রতি সহমর্মী হয় মানুষ, আশপাশের স্বজন ও আত্মীয়। তাদের যতটা পারা যায় আগলে রাখার চেষ্টা চলে। অথচ আমার স্বামী করোনায় মারা যাওয়ায় পাশ থেকে সবাই সরে গেলো।’
তানিয়া বলেন, ‘উনার বর করোনায় মারা গেছে, প্রতিদিন এই কথার মুখোমুখি হচ্ছি। ছাদে গেলে অন্যরা নেমে যাচ্ছে, কথা বলছে না, অনেক কিছু ফেস করছি প্রতিদিন।’
চারপাশের এই স্টিগমাতে অসুস্থ তানিয়া। জানালেন, তিনি দুই জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে কাউন্সেলিং নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘এটা যাদের ওপর দিয়ে যাচ্ছে, কেবল তারাই বুঝতে পারবে। সমাজের এ কেমন আচরণ? বেঁচে থেকেও দুর্বিষহ এক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি।’
স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, করোনায় ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত মারা গেছেন ৬ হাজার ১৫৯ জন। করোনায় আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যদের প্রতি সহমর্মিতা, সহযোগিতা করার বিষয়ে কোভিড অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ বিষয়ক জাতীয় প্রস্তাবিত গাইড লাইনে প্রস্তাব রেখেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, অ্যাবনর্মাল গ্রিফ রিঅ্যাকশন বা গ্রিফ কাউন্সেলিং প্রকৃতপক্ষে সাইকোলজিস্ট বা সাইকিট্রিয়ালিস্ট দেওয়ার কথা নয়। এটা দেবে পরিবারের সদস্য, বন্ধু, ইমাম, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধিসহ আত্মীয়রা। এটা একটা সোশ্যাল সাপোর্ট। এটা তৈরি করা গেলেই কেবলমাত্র গ্রিফ রিঅ্যাকশন দূর হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রিফ হচ্ছে মৃত্যুশোক। সাধারণভাবে মৃত্যুর পর মানুষের গ্রিফ রিঅ্যাকশন বা আবেগের প্রতিক্রিয়া ৪৫ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এরপরও যদি ওই শোক স্থায়ী থাকে এবং তার আবেগ ও আচরণে পরিবর্তন থেকেই যায়, তখন তাকে বলা হয় ‘অ্যাবনর্মাল গ্রিফ রিঅ্যাকশন’। সেটা বেশি হয় অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে। একজন বৃদ্ধ মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুতে পরিবারের সদস্যদের গ্রিফ রিঅ্যাকশন সাধারণ হয়। কিন্তু করোনার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু হলে একজন বৃদ্ধের নাচ্যারাল ডেথও অ্যাবনর্মাল ডেথ হিসেবে গণ্য হবে।
আমরা এখন মৃত্যুর মিছিলে আছি। তাই স্বাভাবিক মৃত্যুকেও অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে মন্তব্য করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই মৃত্যুগুলো মানুষ মানতে পারছে না। অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল, যে কারণে ভেতরে থেকে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে গ্রিফ রিঅ্যাকশন।
করোনাকালে নানা ট্যাবু রয়েছে। সেগুলো সরিয়ে ফেলার জন্য সামাজিক উদ্যোগ দরকার, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দরকার। এটা কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের কাজ নয়। প্রতিটি জায়গায় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষকদের নিয়ে সোশ্যাল সাপোর্ট জোরদার করতে হবে, বলেন ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বুলবুল সিদ্দিকী ও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক নূর নেওয়াজ খান কিছুদিন আগে ‘সোশ্যাল স্টিগমা অ্যান্ড সাফারিংস; পার্সপেকটিভ, প্র্যাক্টিসেস অ্যান্ড ইম্প্যাক্টস অ্যারাউন্ড কোভিড-১৯ ইন বাংলাদেশ’ নামক এক গবেষণা করেন। সেখানে তারা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর আক্রান্ত ব্যক্তি এবং তার পরিবার কীভাবে সামাজিক স্টিগমা বা ট্যাবুর শিকার হচ্ছেন, তা খোঁজার চেষ্টা করেছেন।
‘কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, যে পরিবারগুলো এর ভেতর দিয়ে যাচ্ছে তারা নানাভাবে সামাজিক চাপে থাকছেন, সামাজিক গঞ্জনা রয়েই যাচ্ছে।’
ধারণা ছিল, যেহেতু শহরাঞ্চলে করোনার প্রকোপ বেশি, তাই স্টিগমার বিষয়টি থাকবে না। কিন্তু সেটা ভুল মন্তব্য করে বুলবুল সিদ্দিকী বলেন, গ্রামে করোনার সংক্রমণ কম ছিল বলে সেভাবে বিষয়টি প্রকাশ না হলেও সেখানেও স্টিগমা রয়েছে। শহরের ঘটনা প্রকাশ হওয়াতে সেটা নজরে এসেছে বেশি। পাশাপাশি শহরে ‘একঘরে’ হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। করোনা হলে গোপন রাখার প্রবণতা ছিল, এখনও আছে। মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত এমনকি উচ্চশিক্ষিত মানুষের সামাজিক স্টিগমা বা ট্যাবু রয়ে গেছে এখনও।
শুরুর দিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য মাধ্যমে করোনাকে মানুষের মধ্যে ভুলভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেটা সচেতন বা অসচেতন যেভাবেই হোক। আর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার মতো পরিবেশ বা অভ্যাস আমাদের দেশে তৈরি হয়নি।
এই স্টিগমা দূর করতে সমন্বিতভাবে গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারের দিকে মনোযোগ দিতে হবে জানিয়ে বুলবুল সিদ্দিকী বলেন, ইতোমধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখনও যদি এই স্টিগমা দূর করার জন্য উদ্যোগ না নেওয়া হয় তাহলে তা আরও দীর্ঘায়িত হবে। করোনা অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধির মতো নয়, এটা বোঝাতে হবে মানুষকে, বলেন তিনি।
করোনায় যে ৬ হাজার মানুষের বেশি মারা গেছেন, তাদের সবার কাছের মানুষ রয়েছেন। এই কাছের মানুষগুলো তার মৃত্যুর মাধ্যমে প্রভাবিত হচ্ছে—এটাই গ্রিফ রিঅ্যাকশন বলেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. রাশিদুল হক।
তিনি বলেন, করোনায় মারা যাওয়া প্রতিটি মানুষের পরিবারের সদস্যদের গ্রিফ রিঅ্যাকশন হচ্ছে। কিন্তু এটা ৬ মাসের বেশি হলে তাকে প্যাথলজিক্যাল বা অ্যাবনর্মাল গ্রিফ রিঅ্যাকশন বলা হয়। প্যাথলজিক্যাল গ্রিফ রিঅ্যাকশনের জন্য অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে বা কাছের মানুষদের থেকে সাইকোলজিক্যাল কাউন্সিলং বা গ্রিফ কাউন্সিলিং নিতে হবে, এটা খুব জরুরি।
গ্রিফ রিঅ্যাকশনের রোগীরা মেজর ডিপ্রেশনে চলে যায় জানিয়ে ডা. রাশিদুল হক বলেন, অনেকের মধ্যেই ‘সুইসাইডাল থট’, ‘হেল্পনেস’ চলে আসতে পারে। এই বিষয়টাই সরকারকে বোঝাতে হবে। করোনায় মারা যাওয়া মানুষের পরিবারের কথা কী সরকার একবারও ভেবেছে, প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এই পরিবারগুলো কী অবস্থায় রয়েছে, তাদের কোনও সাপোর্ট, কাউন্সেলিং লাগবে কিনা সেটা আমরা কেউ জানি না। এটা সরকারকে দেখতে হবে, তাদের দায়িত্ব নিতে হবে। গ্রিফ কাউন্সেলিং এবং তাদেরকে সহযোগিতা করার জন্য সরকার থেকে আলাদাভাবে কাজ করা দরকার। যেহেতু প্রতিটি মৃত্যু কাউন্ট হচ্ছে, প্রতিটি মানুষের ঠিকানা জানা। প্রয়োজনে স্থানীয়ভাবে প্রতিটি জায়গায় একজন করে গ্রিফ কাউন্সেলর নির্দিষ্ট করে দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।