জিএনআরটিএফএন তাদের রিপোর্টে বলে, বাংলাদেশ সরকার এই বছরের মে মাসের শেষের দিকে বিভিন্ন সেক্টরের জন্য ১১ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ইউএস ডলারের সমপরিমাণ অর্থের প্রণোদনা ঘোষণা করে। যার মধ্যে ৩ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবাখাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। লকডাউনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রধানমন্ত্রী ৪ শতাংশ সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে। বাজারে নিত্যপণ্য সরবরাহ নিশ্চিত রাখতেও সরকার নানা পদক্ষেপ নেয়। খাদ্য উৎপাদনের ধারা চলমান রাখতে সবরকমের জমিতে চাষের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে। করোনাকালীন কৃষকদের ঋণ দিতে এবং কিস্তি শোধের ক্ষেত্রে চাপ না দিতেও এনজিওগুলোকে নির্দেশ দেয় সরকার।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের তুলনায় এই মৌসুমে বেড়েছে। এ ছাড়া সরকার কম মুল্যে হতদরিদ্রদের চাল সরবরাহ করছে।
জিএনআরটিএফএন জানায়, সম্প্রতি আইসিডিডিআরবি’র এক গবেষণায় বলা হয়েছে ৯১ শতাংশ পরিবার নিজেদের আর্থিকভাবে অস্থিতিশীল মনে করে, যেখানে ৪৭ শতাংশ মনে করে তাদের আয় আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। আয় কমে যাওয়ার ফলে অনেকেই খাবার কিনতে পারছে না এবং অভুক্ত থাকছে।
সংস্থাটি জানায়, সরকারের ঘোষিত আর্থিক সহায়তা এবং প্রণোদনা নিয়ে নানা সমালোচনা হয়েছে কারণ ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে তা নীতিগতভাবে অনুকূলে ছিল এবং হতদরিদ্রদের নগদ সহায়তা ছিল নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য অপর্যাপ্ত। তাছাড়া ৫ কোটি বেকার শ্রমিক ও অস্থায়ী কর্মীরাও পর্যাপ্ত বরাদ্দ পায়নি। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষকদের জন্য সুদমুক্ত ঋণের দাবি করে কয়েকটি সংগঠন।
বাংলাদেশের কৃষকদের একটি বড় অংশই প্রান্তিক এবং তাদের ঋণ নেওয়ার জন্য ব্যাংক একাউন্ট নেই। যার ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কাছে প্রণোদনার অর্থ না পৌঁছালেও বড় বড় উৎপাদনকারীদের বেশ সহায়তা করেছে। হতদরিদ্রদের জন্য সরকার খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করলেও স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে হতদরিদ্রদের তালিকা না করায় অনেকেই তাতে বঞ্চিত হয়।
জিএনআরটিএফএন তাদের প্রতিবেদনে বলে, ত্রাণ ও প্রণোদনা ছাড়ের প্রক্রিয়া বেশ ধীরগতির, সমস্যা জর্জরিত ও যাদের প্রয়োজন তাদের কাছে পৌঁছায়নি। প্রশাসনিক দুর্বলতা ছাড়াও সহায়তা প্রাপ্তির তালিকা তৈরিতেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। যার ফলে খাদ্য সঙ্কটে থাকা অগনিত পরিবার সহায়তা পায়নি। সমন্বয়হীনতার কারণে, আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন ও দুর্নীতির ফলে ত্রাণ ছাড়ে সঙ্কট তৈরি হয়েছে।
রিপোর্টে সংস্থাটি কিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে আছে- অপুষ্টি ও খাদ্য সঙ্কটে থাকা পরিবারদের দ্রুত সহায়তা প্রদান, করোনার কারণে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে যারা কাজ হারিয়েছেন তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়ের খাদ্য ও পুষ্টির অধিকারের ওপর কোভিড -১৯ এর মানবাধিকার প্রভাবের মূল্যায়ন পরিচালনা করা এবং শিশু, নারী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বিশেষ দৃষ্টি প্রদান।
তিনি আরও বলেন, কৃষিখাতের জন্য সরকার পাঁচ হাজার কোটি টাকার ঋণ তহবিল গঠন করলেও ব্যাংকগুলো এই পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা বিতরণ করেছে, যা মোট কৃষি প্রণোদনা তহবিলের মাত্র ৪২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। সেপ্টেম্বর নাগাদ ঋণ পেয়েছে ৭৮ হাজার কৃষক। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক এই ঋণ বিতরণের কথা। যদিও বেশিরভাগ ব্যাংক এই টাকা আবার ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দিয়ে দিয়ে তাদের মাধ্যমে কৃষকের কাছে ঋণ পৌঁছাতে চাইছে। ফলে বিভিন্ন হাত ঘুরে এই প্রণোদনার অর্থ কৃষকদের হাতে কতটা পৌঁছাবে এবং তা কতটা কার্যকরভাবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা ব্যবহার করতে পারবে তা নিয়ে আশঙ্কা আছে। কেননা, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের ক্ষেত্রে গ্রহীতাকে প্রথম সপ্তাহ থেকে কিস্তি পরিশোধ করতে হয়- ফলে তা করোনা, আম্পান এবং বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আদতেই কৃষককে সহায়তা করবে কীনা সেটি বিবেচনা করা দরকার।
তার মতে- এই ঋণের সুদের হার কম হওয়ার ফলে কৃষি খাতে ঋণ বিতরণে আগ্রহ দেখাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। এ কারণে করোনার এ সময়ে কৃষিখাতে ঋণ বিতরণে তেমন গতি দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে জমির কাগজ না থাকা, ঋণ গ্রহণের ট্রাক-রেকর্ড না থাকা ইত্যাদি কারণেও প্রণোদনা থেকে বর্গাচাষী- ক্ষুদ্র কৃষক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক কৃষি কাজ করেন বা কৃষিসমন্ধীয় কাজ করেন এমন কৃষকরা কোনও সহায়তা পাবেন কিনা তাও নিয়েও সংশয় রয়েছে।