বিজয়ের পরেও ঠিক উদযাপনটা হচ্ছিল না

ছবি: সংগৃহীত১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরে বিজয় লাভ হলো। মানচিত্রে জন্ম হলো নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। কিন্তু বিজয়ের যে বাধভাঙা উৎসব, যে উল্লাস তা কোথায় যেন থমকে ছিল। ঠিক উদযাপনটা হচ্ছিল না। কেননা জাতির জনক, স্বাধীনতার ঘোষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনও পাকিস্তানে কারাবন্দি। কোথায় তিনি আছেন তা সঠিক করে তার পরিবার, সহযোদ্ধা, দেশের মানুষ জানতে পারেনি। ফলে আনন্দ ছিল ঠিকই, অপেক্ষা ছিল আরও বেশি। এমনকি বঙ্গবন্ধু পরিবার তখনও ঢাকায় বন্দিদশায় ছিল।

 ১৮ ডিসেম্বর প্রথম জনসভা

বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি না দিলে পাকিস্তানে আক্রমণ করা হবে। এমন বার্তা দেওয়া হয় ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর প্রথম জনসভা থেকে। ঢাকা নগরীর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা একদিকে যেমন ঘন ঘন উল্লাসে ফেটে পড়ছিল সেদিন, তেমনই তারা প্রাণপ্রিয় নেতাকে মুক্তি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে কোনও মূল্যে স্বৈরাচারী ইয়াহিয়া সামরিকজান্তা থেকে মুক্ত করে আনার শপথ গ্রহণ করে। টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মুক্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে এ জনসভার আয়োজন করা হয়। সভায় বিভিন্ন বক্তা বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনে মুক্তিবাহিনীর ঐতিহাসিক জয়ের কথা উল্লেখ করেন।

 

আশুমুক্তি সম্পর্কে জেনারেল অরোরার আশা প্রকাশ

সম্মিলিত ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ১৯ ডিসেম্বর ঢাকায় বলেন, বাংলাদেশ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান শিগগিরই মুক্তি লাভ করে বাংলাদেশে ফিরে আসতে সমর্থ হবেন বলে তিনি আশা করছেন। কলকাতা থেকে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকার ১৮ নম্বর রোডে বেগম মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই আশা প্রকাশ করেন তিনি। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকায় উপরোক্ত বাসায় শেখ মুজিবুর রহমানের ছেলেমেয়েদের আটক করেছিল। মোট ২৬ জন পাঞ্জাবির তাদের বন্দিত্ব নিশ্চিত করে রেখেছিল। এমন করুণ অবস্থায় সেখানে তাদের রাখা হয়েছিল যে দীর্ঘ নয় মাস তারা মেঝেতে শুতেও বাধ্য হয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে লোকজনের সাক্ষাতও সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর পত্রিকায় বিবিসির বরাত দিয়ে প্রকাশিত হয় যে, পাকিস্তানের নবনিযুক্ত প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলি ভুট্টো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে গৃহে অন্তরীণ রেখেছেন। গত ২৫ মার্চ রাতে ইয়াহিয়া সামরিক বাহিনী নিয়ে বাংলাদেশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় বঙ্গবন্ধুকে আটক করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে খবরে জানা যায় যে বঙ্গবন্ধুকে লায়লাপুর কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছিল।

এক্ষেত্রে শেখ মুজিবের বিচার প্রহসনের কথাও উল্লেখযোগ্য। ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুর বিচার শুরুর কথা ঘোষণা করে এবং তার পক্ষ অবলম্বনের জন্য একজন কৌঁসুলিও নিযুক্ত করেন। সেসময় ইসলামাবাদের আরেক ঘোষণায় বলা হয় যে, শেখ মুজিবের বিচার সমাপ্ত হয়েছে। এখন শুধু রায় ঘোষণা বাকি। বিবিসি বলে ইয়াহিয়া কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থা রদবদল করে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিয়ে গৃহে অন্তরীণ করা মানে হচ্ছে ভুট্টো আওয়ামী লীগ প্রধানের সঙ্গে আপসে পৌঁছাতে উদ্যোগী হয়েছেন। তবে এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে তেমন কোনও সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এদিকে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তিপ্রত্যাশী বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে। কেননা খবরে বলা হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে বাইরে এনে গৃহে অন্তরীণ রাখা হয়েছে। কিন্তু তাকে আসলে কোথায় রাখা হয়েছে তা কেউ জানে না। পশ্চিম পাকিস্তানে শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের কোনও গৃহ নেই বলে সকলেরই জানা। ফলে এটি নতুন কোনও চক্রান্ত কিনা তা নিয়েও শঙ্কা দেখা যায়।

বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত না করা পর্যন্ত স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ পাওয়া যাবে না

বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে কারামুক্ত না করা পর্যন্ত স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ পাওয়া যাবে না। গতকাল বিকেলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সভায় এ কথা বলেন তিনি। কর্মীসভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা শহর কমিটির সভাপতি কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস।

এদিকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করার মাধ্যমে সংগ্রামের আরেক অধ্যায় শেষ হবে বলে মন্তব্য করেন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ পরিষদ সদস্য আ স ম আবদুর রব। তিনি বাংলাদেশের ভাইবোনদের উদ্দেশে বলেন, স্বাধীনতা পর্বের এই ঊষালগ্নে আজ প্রথম যে কথা মনে পড়ছে তা হলো ইয়াহিয়া খানের হাতে বন্দি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করার মাধ্যমেই আমাদের সংগ্রামের আরেক অধ্যায় শুরু হবে।