করোনার ভ্যাকসিন কিনতে ৭৩৫ কোটি ৭৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা বরাদ্দ পেয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। রবিবার (২০ ডিসেম্বর) স্বাস্থ্য বিভাগের সচিবের কাছে অর্থ বরাদ্দের পাঠানো চিঠিতে এ তথ্য জানান অর্থ বিভাগের (বাজেট অনুবিভাগ-১) যুগ্ম সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ। সেখানে আপ্যায়ন ব্যয়ের জন্য ৮৯ কোটি ৮৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা ও ভ্রমণের ব্যয় বাবদ ৬ কোটি ৭৬ লাখ ১৯ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু সেই খাতে কোনও অর্থ বরাদ্দ দেয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ভ্যাকসিনের পুরো প্রক্রিয়ায় জেলা পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মিটিংয়ের প্রয়োজন হবে। সেখানে নাস্তার খরচ বাবদ এই টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছিল। মিটিংয়ে জন প্রতি ৩০-৩৫ টাকার চা নাস্তার হিসাব করে ওই টাকা বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে ভ্যাকসিনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে ৬২ হাজার ৪০০ জন কর্মী। তাদের এক বেলার খাবারের খরচ হিসাবে সেটি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, করোনা ভ্যাকসিন ক্রয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাবনা তৈরি করে পাঠায় স্বাস্থ্য অধিদফতর। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখা সেটি যাচাই বাছাই করে অনুমোদন সাপেক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রস্তাবে মোট অর্থের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৮৯ কোটি ৪৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৯টি কোডে ৭৩৫ কোটি ৭৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা অর্থ বিভাগ থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
প্রথম ধাপে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রস্তাবিত করোনা ভ্যাকসিনের ডোজ (ওষুধ ও প্রতিষেধক) বাবদ এক হাজার ২৭১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা চেয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তার বিপরীতে ৬৪৩ কোটি ১১ লাখ ৩২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত হায়ারিং চার্জ ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকার পুরোটাই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রচার ও বিজ্ঞাপন ব্যয়ের জন্য প্রস্তাবিত ১৪ কোটি ১৭ লাখ ৩৮ হাজার টাকার পরিপ্রেক্ষিতে কোনও টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের জন্য প্রস্তাবিত ১ কোটি ২ লাখ টাকার পরিপ্রেক্ষিতেও কোনও টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ভ্রমণ ব্যয়ের জন্য প্রস্তাবিত ৬ কোটি ৭৬ লাখ ১৯ হাজার টাকার পরিপ্রেক্ষিতেও কোনও বরাদ্দ হয়নি। স্বাস্থ্য বিধান সামগ্রীর জন্য প্রস্তাবিত তিন কোটি ৩৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকাও বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
এছাড়া বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পণ্যের ভাড়া ও পরিবহন ব্যয়ের প্রস্তাবিত ৯৩ কোটি ৩০ লাখ ৯৮ হাজার টাকার মধ্যে ২ কোটি ৯৮ লাখ ৪৪ হাজার টাকা, প্রশিক্ষণ ব্যয়ের জন্য প্রস্তাবিত ১৫ কোটি ১৬ লাখ ৬৮ হাজার টাকার মধ্যে ১২ কোটি ৮০ লাখ ৩৭ হাজার টাকা, চিকিৎসা ও শল্য চিকিৎসা সরঞ্জামাদি বাবদ প্রস্তাবিত ৫৮ কোটি ৫৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকার বিপরীতে ৫৬ কোটি ৫৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা, মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের জন্য প্রস্তাবিত ৬ কোটি ২৬ লাখ এক হাজার টাকার পুরোটাই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া জরিপের জন্য প্রস্তাবিত ৯৫ লাখ টাকার বিপরীতে কোনও টাকাই বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। সম্মানী বাবদ প্রস্তাবিত ১০ কোটি চার লাখ ৭৬ হাজার টাকার মধ্যে ২ কোটি টাকা, প্রকৌশলী এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদি বাবদ প্রস্তাবিত ১৩ কোটি ৬৪ লাখ ৭০ হাজার টাকার পুরোটাই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ডাটাবেজ বাবদ প্রস্তাবিত ৩ কোটি ৬৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকার পুরোটাই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে চিকিৎসা ব্যয় বাবদ প্রস্তাবিত ২২ লাখ ৫৪ হাজার টাকার বিপরীতে কোনও টাকাই বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
বাজেটে আপ্যায়ন ব্যয় প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, করোনা ভ্যাকসিন একটি বড় প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে জেলা পর্যায়ের সবাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ভ্যাকসিন প্রক্রিয়ার সময় অনেকবার মিটিংয়ের প্রয়োজন হবে। মিটিংয়ের চা-নাস্তার বিল হয়তো জনপ্রতি ৩০-৩৫ টাকা হবে, সেটাই চাওয়া হয়েছিল। এখন অর্থ মন্ত্রণালয় দেয়নি, অন্যখান থেকে দিতে হবে আমাদের। হয়তো পরেরবার বরাদ্দ চাওয়া হলে দেবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (অর্থ) শেখ মোহাম্মদ মনজুর রহমান বলেন, ভ্যাকসিন কর্মসূচিটি ইপিআই প্রকল্পের দায়িত্বে যিনি আছেন তিনি মহাপরিচালকের পক্ষে করবেন। সেখানে কর্মসূচির দুটি অংশ আছে, একটি ক্রয় কার্যক্রম যেটি সিএমএসডি’র মাধ্যমে হবে। এর বাইরে ট্রেনিং থেকে শুরু করে যা যা আছে সেটি এমআইএস’র ভ্যাকসিনের সঙ্গে যারা যুক্ত তারাই করবে। আমরা শুধু তাদের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলাম। আমি জেনেছি, অর্থ যেটা চাওয়া হয়েছিল সেটি ভ্যাকসিনের সঙ্গে যেসব কর্মী যুক্ত হবেন তাদের এক বেলার খাবার খরচ বাবদ ধরা হয়েছে।
এর আগে ইপিআই প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমএনসি অ্যান্ড এএইচ অপারেশন প্ল্যানের লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. শামসুল হক জানান, টিকা দেওয়ার জন্য সারাদেশে ১০ হাজার ৪০০ টিম করা হবে। প্রতি টিমে ৬ জন করে লোক থাকবে, অর্থাৎ মোট ৬২ হাজার ৪০০ জন কাজ করবেন। যার মধ্যে দু’জন টিকা দেবেন, অন্যরা রেজিস্টার মেইনটেন, লাইন ঠিক রাখা ইত্যাদি কাজ করবেন। এদের জন্য কোনও ভাতার ব্যবস্থা নেই। শুধু দুপুরে খাবার বাবদ ২০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেটাই এখানে আপ্যায়ন ব্যয় হিসাবে দেখানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় ভ্যাকসিন কিনতে ইতোমধ্যে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার। চুক্তির আওতায় প্রথম ধাপে তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন বা টিকা কিনে জনগণের মাঝে বিনামূল্যে দেওয়া হবে। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তৈরি এ টিকার ভারতীয় উৎপাদক সিরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত ৫ নভেম্বর চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে অক্সফোর্ডের তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে সিরাম ইনস্টিটিউট।