২২ মার্চ ১৯৭১। দিনটি ছিল সোমবার। লাগাতার চলা অসহযোগ আন্দোলনের ২১তম দিবস ছিল সেদিন। স্বাধীনতার দাবিতে বিক্ষুব্ধ মানুষের সভা, শোভাযাত্রা এবং গগনবিদারী স্লোগানে রাজধানীর আকাশ-বাতাস মুখরিত ছিল।
এইদিনে ভুট্টোর উপস্থিতিতে মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে আশা প্রকাশ করা হয়, শেষ মুহূর্তে যদি অতি নাটকীয় কিছু না ঘটে তবে অচিরেই সামরিক আইন প্রত্যাহার হতে যাচ্ছে।
২৩ মার্চ ইত্তেফাকের প্রতিবেদনের ভাষায়, ‘এদিকে গতকাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং জনাব ভুট্টো আলোচনার অগ্রগতি হইতেছে বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন। চারি দফা পূর্বশর্ত পূরণ করা না হইলে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিবে না বলিয়া ঘোষণা করিয়া এ ব্যাপারে শেখ সাহেব যে আপোষহীন ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছেন, ইয়াহিয়া-ভুট্টো উভয়েই উহার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হইয়াছেন বলিয়া অনুমিত হইতেছে। সম্ভবত সেই কারণেই অর্থাৎ সামরিক আইন প্রত্যাহার ও গণ-প্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরসহ বঙ্গবন্ধুর দাবি পূরণের ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তেই ভুট্টোর উপস্থিতিতে শেখ সাহেবের সঙ্গে বৈঠক চলাকালেই গতকাল প্রেসিডেন্ট জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আবার স্থগিত ঘোষণা করিয়াছেন। যদি শেষ মুহূর্তে ব্যক্তিবিশেষের কারণে অতি নাটকীয় কিছু না ঘটে তবে অচিরেই সামরিক আইন প্রত্যাহৃত এবং সংশ্লিষ্ট অপরাপর ব্যবস্থা গৃহীত হইতে যাইতেছে।’
লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে
এইদিনে লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু। সকাল সাড়ে ১১টায় প্রেসিডেন্ট ভবনে বঙ্গবন্ধু আলোচনায় মিলিত হন ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর সঙ্গে। প্রায় ৭৫ মিনিটব্যাপী আলোচনা শেষে বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট ভবনের বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার নির্ধারিত বৈঠক ছিল। সে অনুযায়ী আমি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে যাই। সেখানে মি. ভুট্টো উপস্থিত ছিলেন। আমি প্রেসিডেন্টকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি যে, ৪টি শর্ত পূরণ না হলে আমরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করতে পারি না।’
অতঃপর দুপুর ১টায় বাসভবনে ফিরে বঙ্গবন্ধু পুনরায় সাংবাদিকদের ব্রিফিং দেন। বাংলাদেশের সকল দৈনিক পত্রিকায় ‘বাংলাদেশের মুক্তি’ শিরোনামে বাণী পাঠান বঙ্গবন্ধু। সেখানে বলা হয়, ‘চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই সংগ্রাম চলবে। বুলেট, বেয়নেট এবং বন্দুক দ্বারা বাংলাদেশের মানুষকে স্তব্ধ করা যাবে না, কারণ তারা আজ ঐক্যবদ্ধ। আমাদের লক্ষ্য অর্জনে যে কোন প্রকার আত্মত্যাগে আমরা প্রস্তুত। যে কোন আক্রমণ প্রতিহত করতে বাংলাদেশের প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে।’
জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত
সন্ধ্যায় সংবাদপত্রে প্রেরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বলেন, ‘পাকিস্তানের উভয়াংশের নেতৃবৃন্দ এবং রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে সমঝোতার ক্ষেত্র অধিকতর প্রসারিত করার সুবিধার্থে ২৫ মার্চে আহূত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হলো।’
এইদিনে পত্রিকায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পরিকল্পিত বাংলাদেশের পতাকার মাপ ও বিবরণ প্রকাশ করা হয়।