পত্রিকা ছাপাও হয়েছিল, তারপর?

১৯৭১ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়েছিল বাংলাদেশের সাংবাদিক, লেখক বুদ্ধিজীবী সমাজ। নিয়মিত বঙ্গবন্ধুর কথা পৌঁছে দেওয়া কেবল না, কী হতে যাচ্ছে কী করণীয় সেসব নিয়েও নিয়মিত কথাবলা এবং ছায়ার মতো প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুকে অনুসরণের কাজটিও করতো। ফলে গণমাধ্যমকে ঠেকানোও একটি কাজ আকারে সামনে আসে। আর এই কৌশলের অংশ হিসেবে পত্রিকা অফিস পুড়িয়ে দেওয়া, পত্রিকা বাজারে আসতে না দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতেও পিছু হটেনি পাকবাহিনী।

মহান মুক্তিযুদ্ধে ২৫ মার্চ রাতে দৈনিক ইত্তেফাক ভবন পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা অন্যান্য স্থাপনার সঙ্গে দৈনিক ইত্তেফাককেও নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। মার্চ মাসের মধ্যেই অপারেশন সার্চলাইট পরিকল্পনায় সেনানিবাসকে কেন্দ্র করে পাকবাহিনী যে তাণ্ডব চালায় তাতে কেবল বাঙালির মুক্তির আন্দোলনে সমর্থনের কারণে ইত্তেফাক আক্রান্ত হয়েছিল তা নয় সংবাদ ও দি পিপলস অফিসে অগ্নিসংযোগ করে। সংবাদের আগুনে পুড়ে শহীদ হন সাংবাদিক সাবের।

১৯৭২ সালে দৈনিক বাংলা পত্রিকায় এক বছর আগের পত্রিকার অভিজ্ঞতার কথা লেখা হয়- মুক্তি সংগ্রামের, দাবি আদায়ের সংগ্রামে বিক্ষুব্ধ মার্চ, প্রতিরোধ আর চক্রান্ত উন্মোচনের মার্চ। আর এই পঁচিশেই সে সব চক্রান্ত চরমে পৌঁছে চক্রান্তকারীরা নির্লজ্জ হামলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে গোটা বাঙালি জাতির ওপর। বাংলার আন্দোলনের চলতি ধারায় একটা যতি নেমে আসলেও নতুন পথে নতুন গতিতে এগিয়ে যায় লক্ষ্যের দিকে। মার্চের আন্দোলনে গোটা জাতি সর্বশক্তি দিয়ে যোগ দিয়েছিল। এদেশের পত্রপত্রিকা ও বলিষ্ঠ কণ্ঠে সে সংগঠনের বাণি পৌঁছে দিচ্ছিল দিকে দিকে পশ্চিমে ২৫শে মার্চের তাই নেমে আসে পত্রিকাগুলোর ওপরে আঘাত।

২৫শে মার্চের পত্রিকার শিরোনাম ‘ইতিহাসের জঘন্যতম চক্রান্তের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর হুঁশিয়ারি’, ‘প্রতি দফতরে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর’, চট্টগ্রাম বন্দরে গণপ্রতিরোধের খবর ছিল, সৈয়দপুর চট্টগ্রামসহ পুরো দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যা আর উত্তাল গণআন্দোলনের সেদিনের গোটা পত্রিকায় মুদ্রিত হরফের ফাঁকা জায়গাগুলোতে যেন ছিল আসন্ন বিপর্যয়ের ইশারা। কিন্তু তাই কি শেষ? ২৫মার্চ কালে রাতের আগে এদিন ছিল সাংবাদিক-কর্মী সকলের মিলিত শ্রমে পরিপূর্ণ একটি দিন। কিন্তু সেই শ্রমের ফসল দিনের আলোর মুখ দেখেনি। ‘সেনাবাহিনীর শহরে ঢুকে পড়েছে’ এই শিরোনাম দিয়ে মুদ্রিত পরের দিনের কাগজ সেই কালরাতের আড়ালে আত্মগোপন করে।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দলিল, নানা নথি আর্কাইভের কাজের সাথে যুক্ত সালাউদ্দিন দুলক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ২৫ তারিখ থেকেই পত্রিকা বন্ধ ছিল বলা যায়। সেইদিনের যে পত্রিকা বের হয়েছিল সেটা ১৯৭৩ সালে দৈনিক বাংলা ছোট করে মুদ্রণ করেছিল। তখনতো যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। পরবর্তীকালে আমরা ২২ মে ইত্তেফাক পত্রিকা পাই। সেটি কোনওভাবে অনুমতি নিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছিল।