বেনাপোল ও পেট্রাপোল নোম্যান্স ল্যান্ড তথা শূন্যরেখা। ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত ফটক খোলা। কেউ উঁকি দিয়ে ভারত দেখছে, কেউ বাংলাদেশ। কেউ শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে কুশল বিনিময় করছে স্বজনদের সঙ্গে। কেউ একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। সবাই যেন সবার কত আপন! আপনই তো! ব্যবধান নেই ভাষার, সংস্কৃতির। আতিথেয়তাতেও কেউ কারওর চেয়ে কম যায় না! মাঝে কেবল ওইটুকুন সীমান্ত!
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে শুক্রবার (২৬ মার্চ) বিকাল ৫টায় বেনাপোল-পেট্রাপোল শূন্যরেখায় বিজিবি-বিএসএফ যৌথ 'রিট্রিট সিরিমনি' অনুষ্ঠানে ভারত ও বাংলাদেশের নাগরিকদের বসেছিল এক বর্ণিল মিলনমেলা।
এই অনুষ্ঠানে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনার হাবড়া থেকে প্রিয়াঙ্কা নামে এক কিশোরী এসেছে তার চাচা ও মায়ের সঙ্গে।
প্রিয়াঙ্কা আরও বললো, ‘যেমনটি শুনেছিলাম ঠিক তেমন! এখানেও দিগন্তজোড়া সবুজ মাঠ, গাছপালা, নদী। দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেলো।’
এ কিশোরী জানাল, ‘আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের নাম অনেক শুনেছি। বাংলাদেশের তিনি বিরাট নেতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী জানতে পেরে আমরা হাবরা থেকে উপলের এই সীমানায় বিজিবি-বিএসএফের অনুষ্ঠান দেখতে এসেছি।’
বাংলাদেশের ইলিশের প্রশংসা করতেও ভোলেনি প্রিয়াঙ্কা। ‘বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর আমাদের ওখানে ইলিশ যায়। ভীষণ স্বাদ ওটার।’
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া উভয় দেশের মানুষের মধ্যে অনেকে আবার অনেকের আত্মীয়। অনেকেই জানিয়েছেন, সীমান্তে ‘রিট্রিট সিরিমনি’তে আত্মীয় স্বজনদের দেখতে পাওয়ার অনুভূতিটাই আলাদা।
পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চাগদার গৃহবধূ মনজিস্টা সিকদার। স্বামী-সন্তান নিয়ে উপভোগ করতে এসে জানালেন, ‘ভালোই লাগছে। আমার পূর্বপুরুষরা বাংলাদেশে থাকেন। বাংলাদেশ থেকে আসা আত্মীয়দের দেখে অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে।’
একই অনুভূতি জানালেন বনগাঁও থেকে আসা পিয়ালী সরকার, অঞ্জলি রায়, সঞ্চিতা চক্রবর্তী, নমিতা রায়সহ অর্ধশত ভারতবাসী।
এ ছাড়াও বাংলাদেশ-ভারতের আখাউড়া-আগরতলা ও বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ী আন্তর্জাতিক চেকপোস্টে (আইসিপি) উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আয়োজনে যৌথ ‘রিট্রিট সিরিমনি’ প্যারেড হয়। সীমান্তরক্ষীরা প্যারেডের মাধ্যমে উভয় দেশের পতাকা নামান।
বনগাঁও থেকে অনুষ্ঠান দেখতে এসে কলেজপড়ুয়া বিথী রাণী জানালেন, অভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতির কারণে বাংলাদেশকে ভালোলাগে। সুযোগ পেলে বাংলা সিনেমা দেখা হয়। বাংলাদেশেই থাকতো তার পূর্বপুরুষরা। সঙ্গে এসেছেন মা ও বড় বোন।
পিয়ালী সরকার বলেন, ‘বাংলাদেশ খুব সুন্দর দেশ। স্বাধীনতা দিবসে দেশটির সমৃদ্ধি কামনা করছি।’
এ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বেনাপোলের মানুষের মধ্যেও ছিল উচ্ছ্বাস। সাগর নামে বেনাপোলের এক বাংলাদেশি যুবক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘করোনার কারণে অনেকদিন বন্ধ ছিল এই রিট্রিট সিরিমনি। ভারতীয়রা আসায় অনুষ্ঠানটা পূর্ণতা পেলো। আমরা চাই প্রতিবছর এই ভাতৃত্বের অনুষ্ঠান বজায় থাকুক।’
বিজিবির দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন ভূঁইয়া প্যারেডে অংশ নেওয়া বিজিবি ও বিএসএফ’র সকল সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে অত্যন্ত সৌদার্হ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তা আরও বাড়বে। উভয় দেশের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যসহ বিভিন্ন সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ক প্রতিদিনই উন্নতি হচ্ছে।’
বিএসএফ-এর বক্তব্য
বিএসএফের ১৫৮ ব্যাটালিয়নের কমান্ড্যান্ট অরুন কুমার উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে এই বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে নয় থেকে দশ হাজার লোক আসা যাওয়া করে। এতেই বোঝা যাচ্ছে উভয় দেশের মধ্যে কত মধুর সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়াও ব্যবসা বাণিজ্যের সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে।’
তিনিও প্যারেডে অংশ নেওয়া বিজিবি ও বিএসফ’র সদস্যদের ধন্যবাদ জানান।
বক্তব্য প্রদানের পর উভয় দেশের প্যারেডে অংশ নেওয়া সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা একে অপরকে সালাম প্রদান ও গ্রহণ করেন। এরপর উভয় দেশের পতাকা নামানো ও বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফকে মিষ্টি প্রদানের মধ্য দিয়ে ‘বিটিং রিট্রিট’ অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়। এরপর দুই দেশের সীমান্ত ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বিটিং রিট্রিট
সীমান্তজুড়ে ৫৭৮টি বিওপিতে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পতাকা ওঠে। দৃশ্যমান হয় বাংলাদেশের মানচিত্র। সন্ধ্যায় সামরিক কায়দায় পতাকা নামানোর আয়োজনকে বলে বিটিং রিট্রিট। উপমহাদেশে ১৯৫৯ সাল থেকে এটা হয়ে আসছে।
বেনাপোল সীমান্তে হচ্ছে ২০১৩ সাল থেকে। ২০১৮ সালে বাংলাবান্ধা সীমান্তেও বিটিং রিট্রিট সিরিমনি শুরু হয়। এটা মূলত ব্রিটিশ মিলিটারির ঐতিহ্য। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে সৌহার্দ্য বাড়ানোই এই বর্ণিল কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।