আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের আদর্শ ও ত্যাগের রাজনীতি করার পরামর্শ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার মা ফজিলাতুন নেছা মুজিবের উদাহরণ সামনে আনেন। বিভিন্ন সময়ে শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তৃতা-লেখায় বলেছেন, জাতির পিতার আদর্শ বাস্তবায়নে কীভাবে নেপথ্যে থেকে তার মা ভূমিকা রেখেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস আম্মার যে মনোবল দেখেছি, তা ছিল কল্পনাতীত। স্বামীকে পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে গেছে। দুই ছেলে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করছে। তিন সন্তানসহ তিনি গৃহবন্দি। যোগাযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু আম্মা মনোবল হারাননি। জাতির পিতার জন্য প্রেরণা, শক্তি এবং সাহসের এক উৎস ছিলেন বঙ্গমাতা।’
২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর গণভবন প্রাঙ্গণে ছাত্রলীগ আয়োজিত জাতীয় শোক দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ৩২ নম্বর বাড়িতে যখন আমার বাবাকে হত্যা করা হয়, আমার মাকে খুনিরা বলেছিল আপনি চলেন, আমার মা বললেন, কোথাও তো যাবো না। ওনাকে খুন করেছো আমাকেও শেষ করে দাও। আমি এখান থেকে এক পা-ও নড়বো না।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার মা কিন্তু ওদের কাছে জীবন ভিক্ষা চায়নি। তাদের কাছে কোনও আকুতি-মিনতি করেননি। বীরের মতো বুক পেতে দিয়েছিলেন বুলেটের সামনে। সেই কথা সকলকে মনে রাখতে হবে।’
স্বামী কারাগারে যেতেই এলো বাড়ি ছাড়ার নোটিস
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিন্টো রোড থেকে উৎখাত হওয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে এক বক্তৃতায় বলেন, কীভাবে মাত্র ১৪ দিনের নোটিসে তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। আর সেই দুঃসময়ে মা কতো অবিচল ছিলেন।
তিনি বলেন, আমার এখনও মনে আছে তখন আমরা খুব ছোট, কামাল-জামাল কেবল হামাগুড়ি দেয়। তখন মিন্টু রোডের তিন নম্বর বাসায় আমরা একদিন সকাল বেলা উঠে দেখি মা খাটের ওপর বসে আছেন চুপচাপ, মুখটা গম্ভীর। আমি তো খুবই ছোট, কিছুই জানি না। রাতে বাসায় পুলিশ এসেছে, বাবাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। মা বসা খাটের ওপরে, চোখে দুফোঁটা অশ্রু। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবাকই?’ বললেন, ‘তোমার বাবাকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেছে।’
চোখের সামনে থেকে এই প্রথম গ্রেফতার। ১৪ দিনের নোটিশ দিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিল। মা কোথায় যাবেন? কেবল ঢাকায় এসেছেন, খুব কম মানুষকে চিনতেন। মন্ত্রী থাকা অবস্থায় ওই বাসায় মানুষে গমগম করত। কিন্তু ওইদিন সব ফাঁকা! নাজিরাবাজারে একটা বাড়ি পাওয়া গেল। সে বাসায় আমাদের নিয়ে উঠলেন মা।
কারাগারের সময়টা কাজে লাগেনোর পরামর্শ
আজকে যে বঙ্গবন্ধুকে চেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী দিয়ে তার নেপথ্যও ছিলেন বেগম মুজিব। তাকে বলেছিলেন, বসেই তো আছ, লেখো তোমার জীবনের কাহিনি'। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, 'আমার স্ত্রী যার ডাকনাম রেণু, আমাকেকয়েকটা খাতাও কিনে জেলগেটে জমা দিয়ে গিয়েছিলো। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছেন। রেণু আরও একদিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।'
তিনি ছিলেন বিচক্ষণ পরামর্শদাতা
যারা ৬০ এর দশকে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি করেছেন তারা জানেন আওয়ামী লীগে বিচক্ষণ পরামর্শদাতার ভূমিকা পালন করতেন বেগম মুজিব। নেতাকর্মীদের রোগে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, কারাগারে অন্তরীণ কর্মীদের খোঁজ নেওয়া ও তাদের পরিবারের সংকটে পাশে দাঁড়াতেন অনায়াসে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তার 'স্মৃতি বড় মধুর, স্মৃতি বড় বেদনার' প্রবন্ধে লিখেছেন- 'আন্দোলনের সময় বা আব্বা বন্দি থাকা অবস্থায় পার্টির কাজকর্মে বা আন্দোলনে খরচের টাকাও মা জোগাতেন।
২০১৮ সালে বঙ্গমাতার জন্মদিনে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত আলোচনা সভায় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমার মা বঙ্গমাতা বেগম শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ছিলেন আসল গেরিলা। আন্দোলন কীভাবে করতে হবে সেটি তার মায়ের কাছ থেকেই শেখা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, আমার মা এমন গেরিলা ছিলেন, পাকিস্তানিরা কিন্তু তাকে ধরতে পারেনি। এমনকি কোনও রিপোর্ট লিখতে পারেনি তার নামে।