একইসঙ্গে অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির আগে আইনমন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে আপত্তি জানালেও সেটিও আমলে নেয়নি অর্থমন্ত্রণালয়। শিক্ষকদের আন্দোলন দানা বাঁধার পেছনে এই তিনটি কারণকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অস্থিরতা চলমান থাকলে উচ্চ শিক্ষার সঙ্কটের গভীর খাদে প্রবেশ করবে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিস্থিতির জটিলতা মেনে নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ভুল বুঝাবুঝি তো হচ্ছেই। শিক্ষকরা তো সচিবের পদমর্যাদা চাচ্ছেন না। তারা আগের বেতন স্কেল থেকেও দুই ধাপ নিচে নেমে গেছেন। এ কারণেই তো সমস্যা। এই সঙ্কটের পেছনে শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা কাজ করেনি। এ ছাড়া অর্থমন্ত্রণালয়ে তো একজন কাজ করেন না। নানা মতের দায়িত্বশীলেরা কাজ করছেন সেখানে। ফলে অগোচরে একটি সিদ্ধান্ত নিলে সেটা সমস্যা তৈরি করে। তবে আমি খুব আশাবাদী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি অনুধাবন করলে সঙ্কট শেষ হবে।
সূত্র জানায়, শিক্ষকদের আন্দোলন দানা বাঁধার জন্য কিছুসংখ্যক প্রভাবশালী আমলার বাড়াবাড়িকেই দুষছেন সংশ্লিষ্টদের অনেকে। আমলাদের যুক্তিকে বেশি আমলে নেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, যিনি নিজেও একজন আমলা ছিলেন। পলিসির সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর বিভিন্ন সময়ের মন্তব্যও উসকে দিয়েছে আন্দোলন। অর্থমন্ত্রী অবশ্য সংবাদ সম্মেলন করে এ জন্য দুঃখপ্রকাশও করেছেন।
এদিকে গত ১১ জানুয়ারি থেকে শিক্ষকদের লাগাতার কর্মসূচির মুখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হওয়ার দশা। এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বিদেশে থাকায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও থেমে গেছে।
শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ শুক্রবার রাতে লন্ডন গেছেন, ফিরবেন বুধবার। অর্থমন্ত্রী এখন চীনে। ফেরার কথা ১৮ জানুয়ারি।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক ফরিদউদ্দিন আহমেদ বলেন, এখন পর্যন্ত অগ্রগতি নেই। তবে রবিবার সরকারের কাছে ‘প্যাকেজ প্রস্তাব’ পাঠানোর কথা ছিল তাদের।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রস্তাবে ১২% শিক্ষকের জন্য সুপার গ্রেডের আবেদন থাকতে পারে।
গত মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও শিক্ষাসচিব মো. সোহরাব হোসাইনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের কাছে সঙ্কট নিরসনে প্রস্তাব চাওয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মো. সোহরাব হোসাইন এই প্রতিবেদককে বলেন, একবার কোনও সুবিধা দিলে তা প্রত্যাহার করা যায় না। কিন্তু সিলেকশন গ্রেড বন্ধ করায় শিক্ষকদের বেলায় যে বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেটি দূর করতে আরেকটি সোপান তৈরির কাজ চলছে।
শিক্ষার সঙ্গে অর্থের বিরোধ!
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বিষয়টি যেভাবে চাচ্ছেন, অর্থমন্ত্রী সেভাবে চাচ্ছেন না। দুজনই একে অপরের ওপর বিরক্ত। তবে প্রকাশ্যে তারা কেউ, কারও বিরুদ্ধে কিছু বলেননি।
‘বিষয়টি সরকারি বা বেসরকারি অফিসের হিসাব বিভাগের মতো। কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিতে চাইলে প্রথম আপত্তি জানায় হিসাব বিভাগ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হিসাব বিভাগের আপত্তিই টিকে যায়, কর্মকর্তা বা কর্মচারী বঞ্চিত হয়’, জানান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা।
অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলে সিলেকশন গ্রেড তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গ্রেড-১ এ যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বেতনস্কেলের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী কার্যত তৃতীয় গ্রেড থেকেই তাদের অবসরে যেতে হবে।
এত দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট অধ্যাপকের ২৫ শতাংশ সিলেকশন গ্রেড পেয়ে গ্রেড-১ এ যেতে পারতেন। অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী এখন তা পারবেন না। তাহলে এর বিকল্প কী?
‘এই যে সমস্যাটুকু তা একটি সভায় বসলেই সমাধান হতে পারে। কিন্তু কেন যে এটা জিইয়ে রাখা হয়েছে সেটি রহস্যজনক’- মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, যিনি নিজেও সরকারের ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন বলে পরিচিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মধ্যম স্তরের একাধিক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, ওপরের দিকে কিছু আমলা এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সঙ্গে প্রশাসনের যে দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন তা দুঃখজনক।
ওই সব কর্মকর্তার মতে, প্রজাতন্ত্রে প্রত্যেকের কাজের আলাদা গুরুত্ব। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পড়াবেন, আমলা প্রশাসন চালাবেন। এখানে কারও সঙ্গে কারও দায়িত্বে মিল থাকবে না। কেউ-কাউকে অবজ্ঞা করাও ঠিক নয়।
মন্ত্রিসভা কমিটিও ব্যর্থ!
গত ১১ জানুয়ারি থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করে আসলেও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন চলছে গত প্রায় আট মাস ধরে। গত জুলাইয়ে মন্ত্রিসভায় জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন হওয়ার দিন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রসঙ্গটি নিয়ে আলোচনা হয়।
ওই সভায় বেতন বৈষম্য নিরসন সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় সঙ্কট নিরসনে, যে কমিটির প্রধান অর্থমন্ত্রী।
ওই কমিটি এ পর্যন্ত একটি মাত্র বৈঠক করেছে। বৈঠকে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় সেগুলো নিষ্পত্তি ছাড়াই প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। এমনকি একটি বৈঠকের পর আর কোনও সভা হয়নি ওই কমিটির। অন্য সদস্যরা চাইলেও কমিটির সভাপতির দায়িত্বে থাকা অর্থমন্ত্রী আর বৈঠক ডাকেননি।
আইনের আপত্তি উপেক্ষা
অর্থ মন্ত্রণালয় জাতীয় বেতন স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির আগে আপত্তি জানিয়েছিল আইন মন্ত্রণালয়। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় এই আপত্তির কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এ সময় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, অর্থ প্রতিমন্ত্রী আবদুল মাননান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী ছিলেন না।
সূত্রগুলো জানায়, আইনমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে জানান, অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির আগে যেসব বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় আইনি মত দিয়েছিল সেগুলো মেনে নেয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়। তিনি বলেন, ক্যাডার ও নন ক্যাডার বৈষম্য সৃষ্টি না করা, এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজশিক্ষকদের মর্যাদা অবনমনের বিপক্ষে আইন মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট মত ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, আইনি মতামতের ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভিন্নমত থাকলে আবারও দুই মন্ত্রণালয়ের সভা হতে পারত। তারপরও সমাধান না হলে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করে ওনার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একতরফা সিদ্ধান্তে শিক্ষাঙ্গনে বিশৃঙ্খলা অবশ্য এই প্রথম নয়। ক’দিন আগেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ফি-এর ওপর ভ্যাট চাপাতে গেলে তা আন্দোলনে রূপ নেয়। সিদ্ধান্ত ফেরাতে হয় সরকারকে। এরপর বেসরকারি ফি নিয়ন্ত্রণ ও ভর্তি বন্ধ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শুরু হয় নতুন করে নড়চড়। ফলে এ খাতেও নতুন করে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ নিশ্চিত করেছেন মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।
শিক্ষাবিদদের সতর্কবার্তা
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক যতীন সরকার বলেন, শিক্ষকদের আন্দোলনকে গুরুত্ব দিতে হবে। এটা দীর্ঘসময় চলতে পারে না। এতে করে উচ্চ শিক্ষা বিপদগ্রস্ত হবে। আমি মনে করি, খুব সহসা এটা নিয়ে সরকারকে সমাধানে আসতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলনের পেছনে ভুল বুঝাবুঝিকে দায়ী করেছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তিনি বলেন, এটা তো বেশিদিন হলে সম্ভব না। তাহলে উচ্চশিক্ষা অন্ধকারে পড়বে। প্রধানমন্ত্রী কাল বসবেন, আশা করি সমাধানে আসা যাবে।
/এফএ/