আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে অবস্থিত তাজরীন গার্মেন্টে ২০১২ সালে আগুন লাগার পর থেকে আহত শ্রমিকদের বদলে যাওয়া জীবন আরও ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে। ভয়ভীতি আর ‘মালিকের গুন্ডাদের’ হুমকি-ধামকিতে তারা দিন কাটাচ্ছেন। হতাহতের পরিবার যে ক্ষতিপূরণের অর্থ পেয়েছেন সেটা খরচ করা নিয়েও নানা হুমকির শিকার হতে হচ্ছে রোজ। এলাকা ছাড়লে মালিকের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে পারে শঙ্কা থেকে ‘মালিকের লোকজন’ তাদের এলাকা ত্যাগেও বিধিনিষেধ জারি করছেন বলে অভিযোগ তাজরীনের সাবেক শ্রমিকদের।
নিশ্চিন্তপুরে গিয়ে আহত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান,সেখানে মালিকের টাকায় দিন যাপন করেন এমন দশ বারো জন তাদের জীবন অনিশ্চিত করে তুলছেন। বাইপাইল বাসস্ট্যাণ্ডে বসে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আহত শ্রমিক বলেন, আমরা যে কয়টাকা পেয়েছি নানা এনজিও থেকে সে কয়টাকার ভাগও বসিয়েছে গুণ্ডারা।না দিলে ঘরে উৎপাত করে,মামলা দেবার ভয় দেখায়। তিনি বলেন, টাকার লোভ আমাদের সব শ্রমিকদের এক রাখতে পারেনি।আমরা এক সঙ্গে থাকলে কেউ আমাদের এমন বিপদে ফেলতে পারতো না।
আহত শ্রমিক জরিনা বলেন,গুণ্ডারা আমাদের রাস্তায় আসা যাওয়ার পথে বাঁধা দেয়।কি বলে তারা জানতে চাইলে তিনি বলেন,আমাদের মুখ খোলার কারণে মালিক কারাগারে গেলে জীবন থাকবে না,এমন হুমকিও দেয়া হয় আমাদের।আমি এখনও ব্যাথা নিয়ে চলতে বা কাজ করতে পারি না।যে টাকা পাব বলে নানাজনে বলেছিল সেটাও পাইনি।অথচ রোজকার এই হেনস্তা চলছে। তিনি বলেন,আহত নিহতদের পরিবারের যারা এখনও নিশ্চিন্তপুরে আছে তাদের প্রতিও কড়া নজর রেখেছে তারা।এই গুন্ডারা কারা নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন,তারা তাজরীন ফ্যাক্টরির সুবিধাবাদী শ্রমিকদেরই অংশ।ভবনের পাঁচ তলা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়ার পাশাপাশি ডান পা ভেঙে যায় সুইং অপারেটর জরিনা বেগমের।
হাসানুল (ছদ্মনাম) নামের এক শ্রমিক নিশ্চিন্তপুর থেকে বেরিয়ে এসেছেন আরও ছয় মাস আগে। তিনি এখন হেমায়েতপুরে দোকানে কাজ করেন। হাসানুল বলেন,রোজ রাতে ঘরে কেউ না কেউ আসতো আর আমাদের ভয় দেখাতো। যে সামান্য জিনিসপত্র ছিল ঘরে সেটা ফেলেই পালিয়ে এসেছি বলতে পারেন।এই ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনা আজকের না।একটা করে এনজিও নেতারা আসতো,দূর থেকে গুণ্ডারা নজরে রাখতো। ওদের সামনে কিছু বলতো না। আর আমরাও ঢাকা থেকে সাহায্য দিতে আসা মানুষদের কিছু জানাতে পারতাম না। কিন্তু গুন্ডাবাহিনী রোজ ঘরে আসতো আর ভয় দেখাতো। এলাকা ছেড়ে যারা চলে যেতে চেয়েছে তাদের নানাভাবে আটকে রাখতে চেয়েছে। কেন আটকে রাখতে চেয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নজরে রাখতে চেয়েছে যাতে মালিকের বিরুদ্ধে,ফ্যাক্টরির অফিসারদের বিরুদ্ধে কথা না বলি সেজন্য।
অগ্নিকাণ্ডের মামলায় সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখানোর বিষয়টি প্রসিকিউটর মান্নানকে জানানো হলে তিনি বলেন,এধরনের অভিযোগ আমাদের কেউ করেনি।সাক্ষ্য শুরু হয়েছে। আগামী মাসে দিন ধার্য আছে।এর আগে আমাদের জানানো হলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেবো। প্রতিবেদকের মাধ্যমে জেনে তিনি কিছু করতে পারেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, এবিষয়ে যিনি হুমকির শিকার তাকেই অভিযোগ তুলতে হবে। সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য নির্ধারিত একের পর এক দিন পার হয়ে গেলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত সমনই পাঠানো হয়নি সাক্ষীদের।চার্জশিটে যাদের নাম অন্তর্ভূক্ত আছে তাদের তালিকা ধরে নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। এদের বেশিরভাগই সাক্ষ্য দিতে যাবে না বলেও আহত শ্রমিকরা ধারণা করছেন।
প্রতিনিয়ত হুমকি দেয়া হচ্ছে সাক্ষীদের এবং নিরীহ আহত কর্মীদের এই বিষয়টি জানেন কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে মহসিনুল কাদির বলেন, সাক্ষীদের এমন কোন অভিযোগ আমার কাছে আসেনি।যদি কেউ হুমকির সম্মুখীন হয়ে আমার কাছে আসে তাহলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। এ বিষয়ে চিন্তার কিছু নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
হুমকি ধামকির বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাইলে তাজরীন গার্মেন্টের মালিক ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় করা সরকারের মামলার প্রধান আসামী দেলোয়ার হোসেনকে টেলিফোনে পাওয়া যায়নি।
প্রায় তিনবছর পর বাংলাদেশ তাজরীন ফ্যাশন্সের অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। মামলার আসামী কারখানার মালিক দেলোয়ার হোসেন এবং তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তার জামিনে রয়েছেন।
ইউআই/এমএসএম/আপ-এফএস/