আট বছরেও শেষ হয়নি বিচার

রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী পান না, সাক্ষী দিতে নিজ গরজে আদালতে শ্রমিক

২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর। আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন গার্মেন্টসে জ্বলে ওঠা আগুনে পুড়ে মারা যান ১১৪ শ্রমিক। ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও যাদের অবহেলায় এই মৃত্যু, তাদের বিচার না হওয়ায় স্বজন হারানো শ্রমিকের মনে এখনও জ্বলছে ছাইচাপা আগুন। তাজরীন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হওয়ার আট বছর পরও রাষ্ট্রপক্ষ শুনানিতে সাক্ষী হাজির করতে পারছে না বলে মামলা চলে ধীরগতিতে।

যদিও গত জানুয়ারিতে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদালতে উপস্থিত হয়ে শ্রমিকরা আবেদন করেছিলেন, তারা সাক্ষী দিতে চান। সেই শ্রমিকদের দাবি, তাদের সাক্ষী নিতে আগে কেউ যোগাযোগ করেনি এবং তারা আদালতে যাওয়ার পর থেকে নানা হুমকি-ধামকির শিকার হচ্ছেন।

গত ১৩ জানুয়ারি তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের মামলার শুনানির নির্ধারিত দিনে বরাবরের মতো রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে না পারার কারণ দেখান। একই দিনে আসামিপক্ষের আইনজীবী মামলা খারিজ করার জন্য মৌখিকভাবে আবেদন করেন। এসময় আদালতে উপস্থিত শ্রমিকদের একজন বলেন, ‘মহামান্য আদালত আমরা সাক্ষী কিনা জানি না, কিন্তু আমরা তাজরীনের আহত শ্রমিক, শুনানির খবর পেয়ে এসেছি, আমরা সাক্ষ্য দিতে চাই।’

বিচারক তাদের উপস্থিতি আমলে নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিকে সাক্ষ্য তালিকায় উপস্থিত শ্রমিকদের নাম আছে কিনা যাচাই করে দেখতে বলেন। উপস্থিত শ্রমিকদের মধ্যে একজনের নাম তালিকায় পাওয়া গেলে তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।

তারপরও ২৮ ফেব্রুয়ারি তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের নির্ধারিত তারিখে আবারও সাক্ষী হাজির না থাকায় শুনানি ছাড়াই পরের সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ নির্ধারিত হয় মে ২৭। আদালতে উপস্থিত আহত শ্রমিকদের উদ্দেশ করে সেই দিন তাজরীনের মালিক অভিযুক্ত দেলোয়ার আদালত প্রাঙ্গনে আসা শ্রমিকদের হুমকি দিয়ে বলেন, ‘সাংবাদিকদের টাকা দিয়ে প্রমাণ করে দেবো উপস্থিত শ্রমিকরা কেউ আমার কারখানার নয়।’

নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করা আহত এক শ্রমিক বলেন, ‘আমরা আগুনে পুড়েছি, চাকরি হারিয়েছি, স্বজন মরে গেছে, বিচার হয়নি। আর এখন হুমকিও সহ্য করছি। মামলা করার পর থেকে অপেক্ষা করছি, বিচার হবে, আমাদের ক্ষত শুকাবে। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে অপরাধীরা সাহসী হয়ে উঠছে।’

গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি শহিদুল ইসলাম সবুজ বলেন, ‘গত কয়েকটি বছর আমরা আদালতে নিয়মিত হাজির থেকেছি ন্যায়বিচারের দাবি নিয়ে। এখন মালিকপক্ষ এবং অভিযুক্তরা হুমকি দিতে শুরু করেছে। কেবল আমাদের কারণেই নাকি মামলাটা চলছে, না হলে এতদিনে খারিজ হয়ে যেত।’

ন্যায়বিচার প্রশ্নে কী ঘটছে সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষের গাফিলতি আছে। সাক্ষী চোখের সামনে ঘুরছে, অথচ তারা সাক্ষী পাচ্ছে না। কতজন সাক্ষী লাগবে তাদের? সবার চোখের সামনে জ্বলে মরে গেলো ১১৪ জন। তারও নাকি আট বছর সাক্ষী মেলে না।’

মামলার সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর রেহানা আক্তার সাক্ষী না পাওয়া বিষয়ে বলেন, ‘তাজরীনের ঘটনায় যাদের সাক্ষী করা হয়েছে তাদের বর্তমান ঠিকানা তাজরীন দেওয়া, স্থায়ী ঠিকানায় গিয়ে তাদের পাওয়া যায় না। ফলে এতদিনে মাত্র ৯ জনের সাক্ষী হয়েছে। সম্প্রতি পাংশা গ্রামে এক সাক্ষীকে সমন পাঠানো হয়েছে। সমনের ঠিকানায় যে তাকে পায় না সেটাও রিটার্ন আসে না। ফলে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়। শেষ সাক্ষী বলেছেন তারা অনেক সাক্ষী চেনেন, নিয়ে আসার ব্যবস্থা করবেন। আশা করছি এবার কিছু সাক্ষী হাজির করা যাবে। আর দেরি হবে না।’