সুরমা বলে, ‘সেদিন কাজের মধ্যে ছিলাম। হঠাৎ আগুন দেখে তাড়াহুড়ো করে নামতে যাই। এরপর আর কিছু মনে নাই। সিঁড়ির কাছে পৌঁছে অজ্ঞান হয়ে যাই।’
২০১৩ সালের ২৬ জানুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন স্মার্ট গার্মেন্ট কারখানায় মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে নিহত আট জনের বিষয়ে মামলা হলেও বিচার নিশ্চিত করা যায়নি। এমনকি অবহেলাজনিত কারণে মালিককে আটক করা হলেও পরে মামলার কী হলো তা জানা যায়নি।
মামলার এজাহারে ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক শ্রী সুভাষ, মো. শরীফ ও জাকির আহমেদসহ অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করা হয়। আসামিদের অবহেলা ও গাফিলতির কারণে ওই অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ ছিল। মামলার বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন মীর বলেন, “আমিতো কয়েকমাস হলো এসেছি এ থানায়, মামলাটি আমার ‘নলেজে’ নাই। এখনই কিছু বলতে পারছি না।”
গার্মেন্ট শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা বলছেন, হতাহতের সংখ্যা কম হওয়ায় স্মার্ট অগ্নিকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শ্রমিক নিরাপত্তার যে প্রশ্নগুলো উথাপিত হয়েছিল, তা অমীমাংসিতই থেকে গেছে। চুক্তিভিত্তিতে কাজ করা ফ্যাক্টরিগুলো ন্যূনতম কোনও দায়দায়িত্ব নেয় না বলে শ্রমিকদের মৃত্যুঝুঁকিতেই কাজ করতে হচ্ছে।। আর বড় মৃত্যুর মিছিলে সংখ্যায় কম মৃত্যুগুলো স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়।
স্মার্ট গার্মেন্টে নিহত আট জনের মধ্যে যাদের পরিচয় জানা গেছে তারা হলেন- রোজিনা (১৮), কোহিনুর (১৫), নাসিমা (৩০), রাজিয়া (২২), লাইজু (১৭) এবং জ্যোৎস্না (২১)। প্রত্যক্ষদর্শী সুরমার ভাষ্যমতে, অগ্নিকাণ্ডের সময় এক্সিট ডোরের ফটক ছিল বন্ধ। এ কারণে শ্রমিকদের বেরিয়ে আসতে দেরি হয়েছে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে মারা গেছে শ্রমিকরা।
স্মার্ট গার্মেন্টের বিষয়টি তাজরীনের ঘটনার (১১২ জন নিহত) পরপর হয়েছিল বলে এটি একেবারেই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেছে। এমনটা উল্লেখ করে গার্মেন্ট শ্রমিক নেতা তাসলিমা আখতার বলেন, আমাদের দেশের মালিক বা সরকারকে কোনও মৃত্যুই নাড়া দিচ্ছে না। রানা প্লাজায় এক হাজার জন নিহত হলেও তারা বলেন দুর্ঘটনা। তিনি আরও বলেন, স্মার্ট গার্মেন্ট বিজিএমইএ-ভুক্ত ছিল না বলে পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। বিষয় হলো, একেকটা ঘটনা ঘটে আর কিছুদিন পর সেটা আড়ালে চলে যায়।
অ্যাক্টিভিস্ট নৃবিজ্ঞানী সংগঠনের সদস্য সায়দিয়া গুলরুখ বলেন, ‘স্মার্ট এক্সপোর্ট ফ্যাক্টরি অগ্নিকাণ্ডে নিহত শ্রমিকদের প্রাণহানির কারণে যে বিষয়টি সামনে এসেছে তা হলো গার্মেন্ট সেক্টরের সাবকন্ট্রাক্টে কাজের ব্যবস্থা। কোনও নিয়ম-নীতির বাইরে, একেবারেই স্বেচ্ছাচারী একটা ব্যবস্থাপনার মধ্যে দিয়ে ফ্যাক্টরিগুলোতে inditex, berksha-এর মতো নামি-দামি ব্র্যান্ডের পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। আট জন শ্রমিক মারা যাওয়ার পরও যখন এই ব্যবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না তখন বিষয়টা উদ্বেগের। এখনও বেড়িবাঁধ এলাকায় গেলে এমন সব কারখানার দেখা মিলবে যেখানে কোনও রকম অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছাড়া শ্রমিকরা কাজ করছেন। হতাহতের সংখ্যা কম হওয়ায় স্মার্ট অগ্নিকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শ্রমিক নিরাপত্তার যে প্রশ্নগুলো উথাপিত হয়েছিল, তা অমীমাংসিতই থেকে গেছে।’
/এফএ/