এ অধ্যাদেশ প্রণয়নের জন্য মতামত চেয়ে পুলিশ সদর দফতরের প্ল্যানিং অ্যান্ড রিসার্চ (পি অ্যান্ড আর) শাখা চিঠি চালাচালি করে এখন থমকে আছে। তবে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, পুলিশ অধ্যাদেশ-২০০৭ (খসড়া) আদলেই নতুন অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশ অধ্যাদেশ ২০০৭’ নামে যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা যুগোপযোগী একটি প্রস্তাব। উন্নত রাষ্ট্রের পুলিশ কাঠামোর সঙ্গে-সঙ্গে তাল মিলিয়ে করা হয়েছে। পুলিশ অধ্যাদেশে এমন কিছু বিধানের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা কার্যকর হলে পুলিশের বিদ্যমান অনেক সমস্যা দূর হবে। যেমন, পুলিশ সদস্যদের ওপর রাজনৈতিক খবরদারি করার সুযোগ থাকবে না, চারস্তরে পুলিশের জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকবে, জাতীয় পুলিশ কমিশন, অভিযোগ কমিশন, নীতিনির্ধারণী গ্রুপ গঠন ইত্যাদি বিধান কার্যকর করার মধ্যদিয়ে পুলিশের ব্যাপক সংস্কার হবে। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন পুলিশ বিভাগের জন্য পৃথক পুলিশ বিভাগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। যে বিভাগের প্রধানের পদবি হবে ‘চিফ অব পুলিশ’। চিফ অব পুলিশের অধীনে থাকবেন ইন্সপেক্টর জেনারেল, অতিরিক্ত ইন্সপেক্টর জেনারেল, ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল থেকে শুরু করে পুলিশের অন্য পদবির কর্মকর্তারা। পুলিশ বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেলদের মধ্য থেকে একজনকে সরকার চিফ অব পুলিশ হিসেবে নিয়োগ দেবে।
প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের পুলিশের চাকরির পাশাপাশি খণ্ডকালীন অন্য চাকরির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সরকারি জনগুরুত্বপূর্ণ জরুরি কোনও কাজে যেকোনও ব্যক্তিকে বিশেষ পুলিশ নিয়োগ করার বিধান রাখা হয়েছে। পুলিশ কমিশনার, জেলা পুলিশ সুপার অথবা চিফ অব পুলিশ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত যেকোনও কর্মকর্তা সরকারের অনুমতি নিয়ে এ বিশেষ পুলিশ নিয়োগ করতে পারবেন। সেসব ব্যক্তি বেতনভাতা পাবেন।
এছাড়া, খসড়ায় সংক্ষিপ্ত বিচারে ম্যাজিস্ট্রেট সংযুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ রিফর্ম-প্রজেক্টের (পিআরপি) অধীনে ২০০৭ সালে প্রস্তাবিত পুলিশ অধ্যাদেশ-২০০৭ প্রণয়ন করা হয়। তখন অধ্যাদেশটি অনুমোদন করার আগে জনমত যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়। অধ্যাদেশ অনুমোদনের পক্ষে ৭০ হাজার লোক মত দেন। মতামতসহ অধ্যাদেশটি আবার তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হয়। তিনি অভিমতসহ অধ্যাদেশটি পর্যালোচনার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠন করা হয় পর্যালোচনা কমিটি। এ কমিটি অধ্যাদেশের ২৩টি ধারাসহ কয়েকটি উপধারার ব্যাপারে আপত্তি জানায়। যেসব ধারা নিয়ে আপত্তি জানায়, এর মধ্যে সাত নম্বর ধারায় পুলিশের আইজি নিয়োগ প্রক্রিয়া, আট নম্বর ধারায় এএসপি নিয়োগ, ১০ নম্বর ধারার ১- উপধারায় সরকার কর্তৃক পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা না থাকা, ১১ নম্বর ধারায় পুলিশ প্রশাসনের ক্ষমতা, ১২ নম্বর ধারায় ইউনিট প্রধানের ক্ষমতা, ১৩ নম্বর ধারায় পুলিশের আইন উপদেষ্টা, অর্থ উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, ১৫ নম্বর ধারায় জেলা পুলিশ সুপারের ক্ষমতা, ৩৭ নম্বর ধারায় জাতীয় পুলিশ কমিশন গঠন, ৬৮ নম্বর ধারায় পুলিশ সদস্যদের পদোন্নতি, ৯৮ ধারায় পুলিশ প্রধানের ক্ষমতার বিধান রাখা হয়। সেগুলো সংশোধন করে ২০১৩ সালে ফের একটি প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ করা হয়। যা এখনও প্রস্তাবিত আকারে রয়েছে।
এ বিষয়ে সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা জানান, সবাই পুলিশের সেবার কথা বলেন। কিন্তু পুলিশ কোন আইনের মধ্যে থেকে সেবা দেবে? কিভাবে দেবে? এসব বিষয়ে আরও বহুদিন আগেই সংস্কারের প্রয়োজন ছিল। এখনও সময় আছে পুলিশের জন্য একটি যুগোপযোগী আইন করে নাগরিকদের সেবা নিশ্চিত করার।
২৬ জানুয়ারি শুরু হয়েছে পুলিশ সপ্তাহ ২০১৬। পুলিশ বাহিনীকে আধুনিকায়নের পাশাপাশি একটি যুগোপযোগী আইনের দাবি এবারও রয়েছে।
পুলিশের যুগোপযোগী একটি আইনের উপলব্ধি পুলিশ সদস্যরা করছেন। বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোশিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ‘পুলিশের সেবা, জনগণের কাছে জবাবদিহিতার জন্য যুগোপযোগী একটি আইনের প্রয়োজন। সে অনুযায়ী কাজ চলছে। এটি বাস্তবায়িত হলে পুলিশ বাহিনী আরও সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রিফর্মের কিছু কাজ হয়েছে। নারী ও শিশুদের বিষয়ে বিশেষ নজরদারি দেওয়া হয়েছে। নারীবান্ধব থানা তৈরি করা হয়েছে। নারীরা যেন নির্ভয়ে তাদের সমস্যার কথা বলতে পারে সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে অনেকের অভিমত নেওয়া হয়েছে, প্রয়োজনে আবারও নেওয়া হবে।’
/এমএনএইচ/