১১ লাখ আবেদন পেন্ডিং রেখে প্রকাশ হচ্ছে হালনাগাদকৃত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা

১১ লাখেরও বেশি নতুন ভোটার আবেদন অনিষ্পন্ন রেখেই হালনাগাদকৃত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। হালনাগাদে সাড়ে ১৫ লাখের মত নতুন ভোটার যুক্ত হতে যাচ্ছে। নতুন ভোটার যুক্ত হলে দেশে মোট ভোটার দাঁড়াবে ১১ কোটি ৩৩ লাখের কাছাকাছি। নির্বাচন কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে ভোটার তালিকা হালনাগাদে মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহের কথা থাকলেও গত দুই বছর সেটা করা হয়নি। ফলে ভোটার নিবন্ধনে নির্বাচন কমিশনের মাঠ পর্যায়ের দফতরে গিয়ে অফলাইনে ও অনলাইনে প্রাপ্ত আবেদন এবং ২০১৯ সালে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সংগ্রহের সময়ে ১৬ বছর বয়সীদের যে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল তাদের তথ্যই এই হালনাগাদে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।

ভোটার তালিকা আইন অনুযায়ী প্রতি বছর ২ মার্চ হালানাগাদকৃত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রবিবার নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় অনলাইনে ভোটার আবেদন পেন্ডিং থাকার তথ্য উপস্থাপন করা হয়। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক একেএম হুমায়ূন কবীর নতুন ভোটারদের ঝুলে থাকা অনলাইন আবেদনের বিষয়টি তোলেন। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সেন্ট্রাল সার্ভারে ১১ লাখ ১৪ হাজার ৩৩টি আবেদন পেন্ডিং রয়েছে বলে জানান।

ওই বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী ইসির ১০টি অঞ্চলের মধ্যে ঢাকা অঞ্চলে সব থেকে বেশি এবং বরিশাল অঞ্চলে সব চেয়ে কম আবেদন পেন্ডিং আছে। ঢাকা অঞ্চলে ২ লাখ ৯ হাজার ৮৮টি, কুমিল্লায় ২ লাখ ২ হাজার ৬৮০টি, ময়মনসিংহ অঞ্চলে ১ লাখ ৪৫ হাজার ১৬৪টি, চট্টগ্রামে ১ লাখ ৪৩ হাজার ১৫৬টি, খুলনা অঞ্চলে ৮৮ হাজার ৭৪টি, রাজশাহীতে ৮০ হাজার ২১৪টি, রংপুরে ৭৫ হাজার ৯৮৪টি, সিলেটে ৭৫ হাজার ৮৮৯টি, ফরিদপুরে ৫৩ হাজার ৮৭১টি এবং বরিশাল অঞ্চলে ৩৯ হাজার ৯০৯টি আবেদন পেন্ডিং আছে।

অবশ্য নির্বাচন কমিশনের কয়েকজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানান, যত সংখ্যক আবেদন পেন্ডিং থাকার কথা বলা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা আরও কম হবে। তাদের দাবি, এসব আবেদন পেন্ডিংয়ের জন্য তাদের চেয়ে আবেদনকারীদের দায়ই বেশি। তারা আবেদন করলেও সময়মত ছবি তুলতে আসছে না। আবার কেউ কেউ একাধিকবার আবেদন করার কারণেও সমস্যা হচ্ছে। যার কারণে ওইসব আবেদন অনিষ্পন্ন থেকে যায়। আবেদন সময়মতো নিষ্পন্ন না হাওয়ার কারণ হিসেবে কর্মকর্তারা মাঠ প্রশাসনের জনবল সংকটের কথাও জানান।

কর্মকর্তাদের মতে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা গেলে এত সংখ্যক আবেদন পেন্ডিং থাকতো না। তারা জানান, তথ্য সংগ্রহ করলে যেমনটি ভোটার হওয়ার যোগ্য নাগরিক যেমন বাদ পড়ার আশঙ্কা কম থাকতো। তেমনি নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ক্লাস্টারগুলোতে গিয়ে ছবি তোলা হলে বেশিরভাগকে পাওয়া যেতো। জানা গেছে, বিদায়ী কে এম নূরুল হুদা কমিশন ২০২১ সালে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিলেও সেটা বাড়ি বাড়ি গিয়ে হবে নাকি নির্ধারিত কিছু কেন্দ্রে গিয়ে হবে সেই মতপার্থক্যের কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি।

মাঠ প্রশাসনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবেদনকারীদের মধ্যে ছবি তুলতে না যাওয়ার ঘটনাও যেমন রয়েছে তেমনি ছবি তোলার সিরিয়াল না পাওয়ার অভিযোগও আছে। বেশিরভাগ উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিসে সপ্তাহে মাত্র একদিন ছবি তোলা ও বায়োমেট্রিক গ্রহণ করা হয় যার কারণে তারা সময়মতো সিরিয়াল পান না। কোথাও কোথাও ছবি তোলার নির্ধারিত দিনে আবেদনকারীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এছাড়া গত ৬ মাসের বেশি সময় ধরে ইসির মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সদ্য সমাপ্ত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে ভোটার হালনাগাদসহ  নিয়মিত কাজে বেশ বিঘ্ন ঘটেছে বলে জানা গেছে।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গাফিলতির কারণে ভোটার পেন্ডিং রয়েছে বিষয়টি এমন নয়। অনেকে অনলাইনে আবেদন করার পর তাদের এসএমএস দিয়ে ছবি তোলার এবং বায়োমেট্রিক দেয়ার জন্য বলা হলেও তাদের সাড়া মেলেনি। আর স্বাভাবিকভাবেই এটা না হলে ভোটার নিবন্ধন আবেদন নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। এছাড়া কিছু আবেদন পাওয়া গেছে যারা অতীতেও আবেদন করেছেন এবং কিছু রয়েছে আবেদন অনিষ্পন্ন। ফলে এসব ভোটার আবেদন পেন্ডিং রয়েছে।

তিনি বলেন, তার অঞ্চলে ভোটার নিবন্ধনে আবেদনকারীদের মধ্যে যারা সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন তাদের কাউকেই আটকে রাখা হয়নি। তারা সকলেই ভোটার হতে পেরেছে। অনলাইনে ভোটার হওয়ার বিধান চালু হওয়ার পর খুলনা অঞ্চল থেকে ৭০ হাজার ১৩২ জনকে নতুন ভোটার করা হয়েছে বলে তিনি জানান। এনআইডির ডিজি একেএম হুমায়ূন কবীর বলেন, আমরা জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে কাজ করি। ভোটার তালিকা নির্বাচন কমিশনের বিষয়। আর ভোটার আবেদন পেন্ডিং থাকার বিষয়টি আমার জানা নেই। এই বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না।

ভোটার হালনাগাদ

আইনি বাধ্যবাধকতায় বুধবার (২ মার্চ) হালনাগাদকৃত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে ১৫ লাখ ৭১ হাজার ১০০ জন নতুন ভোটার দেশের বিদ্যমান ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। নতুনরা যুক্ত হলে দেশে মোট ভোটার দাঁড়াবে ১১ কোটি ৩২ লাখ ৯১ হাজার ৭৬৯ জনে। এবার যে ১৪ লাখ ২ হাজার ৫০৬ জন নতুন ভোটার হচ্ছেন, তাদের বড় অংশের তথ্য ২০১৯ সালে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সংগ্রহ করেছিল ইসি। তখন তাদের বয়স ছিল ১৬ বছর। দুই বছরে তাদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় তাদেরকে ভোটার তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় অনেকে স্ব উদ্যোগে আবেদন করে ভোটার হয়েছে সেটাও যুক্ত হচ্ছে এই তালিকায়।

সর্বশেষ ২০২১ সালের ২ মার্চের হালনাগাদের তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট ভোটার ১১ কোটি ১৭ লাখ ২০ হাজার ৬৬৯। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫ কোটি ৬৫ লাখ ৯৮ হাজার ৫, মহিলা ভোটার ৫ কোটি ৫১ লাখ ২২ হাজার ২২৩ এবং হিজড়া ভোটার ৪৪১।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম আমাদের অগ্রাধিকার কাজের তালিকায় রয়েছে। গত বছর করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে এ কার্যক্রম নেওয়া হয়নি। এবার এ কার্যক্রম নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।