ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি

ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্প অনুমোদনের ২৪ বছর কেটে গেলেও এখনও প্রকল্পের কাজ শেষ না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তরা। তারা জানিয়েছেন, এ সময়ে প্রায় ১৫ হাজার ফ্ল্যাট বরাদ্দের কথা ছিল। কিন্তু হয়েছে মাত্র দুই হাজার, রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ। এর ওপর আবার গত এক যুগ ধরে কাজই বন্ধ রয়েছে।

বৃহস্পতিবার (০৩ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর স্বাধীনতা হলে ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এ নিয়ে কথা বলেন বক্তারা। তারা বলেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংগ্রাম পরিষদ বার বার কর্মসূচি পালন করছে, বঞ্চিতদের মধ্যে জমছে ক্ষোভ। সমস্যা সমাধানের সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুর রউফ আকন্দের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক সাবেক সংসদ সদস্য নাজমুল হক প্রধান।

প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন শ্রমিক কর্মচারী পেশাজীবী মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদের সদস্য সচিব ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী। মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন পরিষদের কার্যকরী সভাপতি মো. আব্দুল জাব্বার মিয়া, সঞ্চালনা করেন আয়োজক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন দুলাল।

সভায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা এ বি এম সুলতান আহমেদ, সাংবাদিক পার্থ সারথি দাস, আয়োজক সংগঠনের নেতা রতন খান, জাহাঙ্গীর আলম, আব্দুস সাত্তার, খাদিজা রহমান, রফিকুল ইসলাম, আবুল হোসেন, আছিয়া খানম নিলু, খাদিজা রহমান, সাহিনুর বেগম, আবুল হোসেন প্রমুখ।

বক্তারা বলেন, বছরের পর বছর ধরে বস্তিবাসীরা অসহায় অবস্থায় আছেন। তারা আজ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বন্দি।

সভায় মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ১৯৭৪ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা মহানগরীর ছিন্নমূল ভাসমান বাস্তুহারাদের একত্রিত করে মিরপুরের ভাসানটেকে সরকারি জমিতে বসবাসের ব্যবস্থা করেন। তাদের পুনর্বাসন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর আর ভাসানটেক বস্তিবাসীর পুনর্বাসন হয়নি। ১৯৯৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অজান্তে পূর্ত প্রতিমন্ত্রী আফছার উদ্দিন বুলডোজার দিয়ে বিনা নোটিশে আকস্মিকভাবে ভাসানটেক বস্তির হাজার হাজার বাসিন্দাকে উচ্ছেদ করেন।

ভাসানটেক বস্তি উচ্ছেদের সংবাদ পাওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ওই সময়ের সংসদ সদস্য প্রয়াত আইভি রহমান, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনসহ অন্যান্য নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সশরীরে ভাসানটেক বস্তিতে যান।

বস্তিবাসীর আহাজারি দেখে তিনি পুনর্বাসনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি আরও ঘোষণা দেন যে, পুনর্বাসন না করা পর্যন্ত তাদের উচ্ছেদ করা হবে না। ভাসানটেক বস্তি, আগারগাঁও বস্তি, সোনারগাঁও হোটেলের পাশের বস্তিসহ ঢাকার বিভিন্ন বস্তির বাসিন্দাদের পুনর্বাসন করার জন্য ভাসানটেকে সরকারি জমি বরাদ্দ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।

একনেক সভায় বরাদ্দ 

১৯৯৮ সালের ২৪ মে একনেক সভায় ভাসানটেকে ৪৭ দশমিক ৪ একর সরকারি জমি বিনামূল্যে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সে সময় ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্প নামে একটি পাইলট প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০০৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর নর্থ-সাউথ প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের সঙ্গে ভবন-ফ্ল্যাট নির্মাণের লক্ষ্যে সরকারের পক্ষে ভূমি মন্ত্রণালয়ের একটি চুক্তি হয়। চুক্তির পর ১৫ হাজার ২৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণের কথা থাকলেও মাত্র ১২টি ভবনে প্রায় দুই হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হয়।

মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেন, চুক্তিপত্রের শর্তভঙ্গ করে বস্তিবাসীকে ফ্ল্যাট না দিয়ে মনগড়াভাবে অবৈধ পন্থায় ধনী ব্যক্তিদের নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্য নিয়ে সেগুলো বিক্রি শুরু করলে বস্তিবাসীরা আন্দোলন সংগ্রাম করেন।

তারা আরও বলেন, আন্দোলনের মুখে ভূমি মন্ত্রণালয় ২০১০ সালের ১২ অক্টোবর চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে। এ পর্যন্ত মাত্র দুই হাজারের কাছাকাছি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উচ্ছেদ হওয়া বস্তিবাসীদের অনেকেই মারা গেছেন। অবশিষ্ট বস্তিবাসী ও মৃতদের ছেলে-মেয়েরা আজও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ছিন্নমূল-ভাসমান হিসেবে বাস করছে।

আয়োজক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন দুলাল বলেন, বছরের পর বছর ধরে বস্তিবাসীরা অসহায় অবস্থায় আছেন। তারা আজ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বন্দি।

সভায় ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্প পুনরায় চালু করে ফ্ল্যাট নির্মাণের মাধ্যমে বস্তিবাসী ও নিম্নবিত্তদের নামে অবিলম্বে বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানানো হয়। বরাদ্দপ্রাপ্তদের ফ্ল্যাটের অনুকূলে সর্বনিম্ন সুদে ব্যাংক লোন দিয়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে পরিশোধের ব্যবস্থা করে বস্তিবাসী ও নিম্নবিত্তদের কষ্ট লাঘবের দাবি জানানো হয়।