পশ্চিম পাকিস্তানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছিল পরদিনের পত্রিকা

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। উত্তাল চারপাশ। বঙ্গবন্ধুর সোহরাওয়ার্দীর বক্তৃতা শুনে জনগণ করণীয় নির্ধারণ করে ফেলেছিল। কী ছিল সেই বক্তৃতায়। পরের দিন ৮ মার্চের বাংলা-ইংরেজি সব পত্রিকায় প্রথম পাতাজুড়ে স্থান করে নিয়েছিল সেই নির্দেশনা। প্রতিবেদন আর ছবিতে ছাপানো পত্রিকা ৫০ বছর পরেও সাক্ষ্য দিচ্ছে ঐতিহাসিক সেইদিনের।

দৈনিক ইত্তেফাকে ১৯৭১ সালের ৮ মার্চ পত্রিকায় পুরোটা জুড়ে ছিল বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার বিভিন্ন অংশ। শিরোনামে ছিল, পরিষদে যাওয়ার প্রশ্ন বিবেচনা করতে পারি কোন কোন শর্তে তার বিশ্লেষণ, আজ থেকে কী নির্দেশ মানতে হবে সেইসব বিষয়। আর একটি প্রতিবেদন ছিল যেখানে ঢাকা বেতার বন্ধের কথা জানানো হয়। পত্রিকাটির প্রথম পাতা দেখে মনে হয়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রাথমিক পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছে। সুবিশাল জনসমাবেশের ছবি যেন সেই পথের সাক্ষ্য দেয়।2 (3)

দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার পুরো অংশ জুড়ে ছিল বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন নির্দেশনা। ‘সামরিক আইন প্রত্যাহার করা সৈন্যদের ছাউনিতে ফিরিয়ে নাও: শেখ মুজিবের ঘোষণা’ ছিল শিরোনামে। দৈনিক পাকিস্তানের প্রথম পাতাতেই ব্যানার হেডলাইন ‘সংগ্রাম চলবেই’ রক্ত গরম করে দেয় যেন। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ, লক্ষ কণ্ঠের বজ্রপাত, ঢাকা বেতার নীরব থাকাসহ বিভিন্ন নির্দেশনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। পুরো পাতাজুড়ে ছিল সারাদিনের জনসমাবেশের বিভিন্ন সংবাদ।

3

দৈনিক আজাদ পরের দিন শিরোনাম করেছিল ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’, ‘অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলন চলবে’। প্রথম পাতার লোয়ার ফোল্ডজুড়ে জনসমুদ্রের ছবি ছাপা হয়। প্রথম পাতাতেই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান মোজাফফর আহমেদ বিবৃতি দিয়ে মুজিবের দাবিকে ন্যায়সঙ্গত বলে অভিহিত করেন।

2 (1)

একটি প্রেস নোট প্রকাশ করা হয়। যেখানে বলা হয়, ‘যে পরিস্থিতি চলছে বলা হচ্ছে এবং যে পূর্ব পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সময়ে গোলযোগের সময় আইন রক্ষাকারী বাহিনী এজেন্সিগুলো শত শত ব্যক্তিকে নিহত করেছে বলে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করার জন্য জনগণের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বাস্তব ঘটনা ও অবস্থান তুলে ধরা প্রয়োজন। ভীতিকর গালগল্প ও অপপ্রচারের সহজ শিকারে পরিণত জনসাধারণের অবগতির জন্য প্রকৃত অবস্থা জানাতে এই প্রেস নোট।’

পূর্ব দেশে প্রথম পাতায় বলা হয়েছে, এদিন বঙ্গবন্ধু বেতারে ভাষণ দেবেন। গভীর রাতে ঢাকা বেতার কর্মচারী সূত্রে পাওয়া খবর প্রকাশ হয়েছে– ৮ মার্চ সকাল ৮টায় ঢাকা বেতার থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের রমনা রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত ভাষণের পূর্ণ বিবরণ প্রচার করা হবে। সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা থেকে তা রিলে করা হবে। সে কারণে ঢাকা বেতারে নিয়োজিত কর্মচারীরা কাজে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন।

4

শেখ মুজিবের একটি বিবৃতিও এদিন প্রকাশ করা হয়। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান এদিন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘হঠাৎ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণার পর ৬ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ সামরিক বাহিনীর শিকারে পরিণত হয়। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার বিরুদ্ধে প্রতিরোধকারী নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর গুলি চালানো হয়। যারা গুলিতে নিহত হয়েছেন তারা শহীদ। তারা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার একতরফা আকস্মিক ঘোষণার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিবাদ করেছিল।’

5

ঐতিহাসিক সেই দিনটি প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘সেদিনের বক্তৃতা যে শুনেছে, তার নির্দেশনা বুঝতে কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা না। এবং পত্রিকায় বেতারে পরের দিন সুস্পষ্টভাবে তা প্রচার করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কী বলেন, তরুণরা সেটা শোনার প্রতীক্ষায় ছিল।’