২০২২ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য ৮৮ কোটি ডলার সহায়তা চেয়েছে জাতিসংঘ।
মঙ্গলবার (২৯ মার্চ) ২০২২ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) কক্সবাজার ও ভাসান চরে অবস্থিত প্রায় ৯ লাখ ১৮ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশেপাশে থাকা প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশি মিলিয়ে মোট প্রায় ১৪ লাখ মানুষের সহায়তার জন্য এই অর্থ চাওয়া হয়।
এই প্রথমবার জেআরপি-তে ভাসান চরের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য মানবিক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে ২৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘গত বছর জাতিসংঘ ৯৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার চেয়েছিল এবং বিভিন্ন বন্ধু ও দাতা রাষ্ট্রের কাছ থেকে পেয়েছিল ৬৭ কোটি ৫ লাখ ডলার। গত বছরের তুলনায় এ বছর জেআরপির পার্থক্য হচ্ছে— ভাসানচর নিয়ে যে সমস্যা ছিল, সেটি এবার দূর হয়েছে এবং এ বছরের ৮৮ কোটি ডলারের মধ্যে ভাসানচরের জন্য ১০ কোটি ডলার আলাদা করে রাখা হয়েছে।’
বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে ২০২২ সালের জেআরপি অনুযায়ী কাজ করবে ১৩৬টি সংস্থা, এর মধ্যে ৭৪টি হচ্ছে বাংলাদেশি বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন।
রোহিঙ্গা সংকট যেন হারিয়ে না যায়
বর্তমানে যখন বিশ্বব্যাপী বাস্তুচ্যুতির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, ইউএনএইচসিআর ও অংশীদার সংস্থাগুলো নিশ্চিত করতে চাচ্ছে, যেন পৃথিবী রোহিঙ্গাদের মানবিক সংকটকে ভুলে না যায়। সেজন্য শরণার্থীদের ও তাদের আশে-পাশে থাকা স্থানীয় জনগণের প্রয়োজন মেটাতে চলমান অর্থায়ন ও সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জেআরপিতে যা চাওয়া হয় সেটির ৭০ শতাংশের বেশি গত বছর পাওয়া গিয়েছিল। অন্যান্য বছরের চিত্রও একইরকম। গত একবছরে বিশ্বে কয়েকটি সংকট তৈরি হয়েছে। আমরা চাই, রোহিঙ্গা সংকট যেন হারিয়ে না যায়।’
প্রত্যাবাসন
প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের উদ্যোগে কার্যক্রম চালানোর জন্য মিয়ানমারে সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিল জাতিসংঘ।
শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘বৈঠকের আগে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার প্রধানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারা আমাকে জানিয়েছে, ওই চুক্তিটি নবায়ন করা হয়েছে। আমার মনে হয়, এটি একটি ভালো লক্ষণ।’
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি হচ্ছে প্রত্যাবাসন এবং অপরটি মানবিক সহায়তা। এ বৈঠকটি মানবিক সহায়তা সংক্রান্ত। কিন্তু এখানেও বক্তারা সবাই প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিয়েছেন।’
শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘আমরা বলেছি, বিশ্ব যখন কিছুই করছিল না, তখন সরকারের উদ্যোগে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে এবং এটি যদি না করা হতো, তবে সমসাময়িক সময়ের অন্যতম বড় একটি সংকট তৈরি হতো। যা শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তে এড়ানো গেছে। এ কারণে সবাই বাংলাদেশকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।’
পরিবেশ সংকট
রোহিঙ্গাদের জন্য পরিবেশের যে বিপর্যয় হয়েছে, সেটি পুনরুদ্ধারের জন্য কাজ করা হবে। জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জন্য ক্যাম্প তৈরি করতে গিয়ে ৬ হাজার হেক্টর জমিতে যে বনায়ন ছিল, সেটি নষ্ট হয়েছে। ওই এলাকায় পুনরায় বনায়ন করার জন্য কার্যক্রম অব্যাহত আছে।’
তিনি বলেন, ‘ভৌগলিক অবস্থান বিবেচনা করলে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এ বছরের জেআরপি তাই পুনঃবনায়ন ও জ্বালানি সহায়তাসহ দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনের জন্য বর্ধিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার কয়েক দশক ধরে উদারভাবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে আসছে।’
মিয়ানমারেই সমাধান
এই মানবিক সংকটের সমাধান শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারেই নিহিত। অনেক রোহিঙ্গা শরণার্থী পরিস্থিতি অনুকূল হলে তাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি জানান, শরণার্থী প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে ইউএনএইচসিআর ও অংশীদার সংস্থাগুলো মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাদের উপস্থিতি বজায় রাখছে। যতদিন পর্যন্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরতে না পারছে, ততদিন তাদের জীবন রক্ষাকারী সুরক্ষা ও সহায়তা দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সহায়তা অতীতের মতোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।