স্বাধীনতার দেড়মাস পর অবরুদ্ধ মিরপুর মুক্ত হয়েছিল আজ

জল্লাদখানা কোথায়!

জল্লাদখানায় ঢোকার প্রবেশমুখমিরপুর ১০ এর কাছে গিয়ে বড়সড় একটা দোকানে ঢুকে জানতে চাইলাম জল্লাদখানা কোথায়? চিনলেন না। হেঁটে যাওয়া অফিস যাত্রীদের কাছে জানতে চাইলে অচেনা ভাব নিয়ে বিষ্ময়! জল্লাদখানা আবার কি? ১০ নম্বর গোলচক্কর পার হয়ে হাতের ডানের গলিতে ঢোকার মুখে ভ্যানের ওপর কাপড় বিক্রি করছেন রাশেদ হোসেন। তাকে জিজ্ঞেস করতেই হাতের ইশারায় দেখিয়ে দেন রাস্তা।
চিপা রাস্তার মধ্য দিয়ে গাড়ি একটু ঘুরে গলির মুখে যেতে সাইনবোর্ড, এই সেই বহুল আলোচিত জল্লাদখানা! ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও অবরুদ্ধ ছিল মিরপুর। প্রায় দেড়মাস সেখানে রক্ত ঝরেছে বাঙালি জনগোষ্ঠীর। আর এই জল্লাদখানায় সেই লাশ গুম হয়েছে। স্বাধীনতার এত বছর পরেও সেই ‘জল্লাদখানা বধ্যভূমি ১৯৭১’র ঠিকানা এলাকায় বসবাসকারীদেরও অজানা। তবে জানানোর উপায় বের করা হচ্ছে। সেখানে একটা টাওয়ার বানানো হচ্ছে যাতে দূর থেকেই নজরে পড়ে।


মিরপুর ১০ নম্বর গোলচক্কর থেকে ১১ নম্বরের দিকে কিছুটা আগালেই মিরপুর বেনারশি পল্লীর প্রথম গেট ধরে পাকা রাস্তাটা আধা কিলোমিটারেরও কম যেতে যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, ঠিক সেখানেই একটা বড়সড় সাইনবোর্ডের কালো জমিনে সাদা সাদা বড় হরফে উপরোক্ত কথাটি চোখে পড়বে।
১৯৭১ সালে বিহারি অধ্যুষিত মিরপুরের অনেকগুলো জায়গাই হয়ে উঠেছিল বধ্যভূমি। এমনি দুটি স্থানে পরে ১৯৯৯ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর খনন কাজ চালায়। স্থানীয়ভাবে এই জায়গা দুটি পরিচিত ছিল জল্লাদখানা ও নূরী মসজিদ বধ্যভূমি হিসেবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক বিগ্রেডিয়ারের সহযোগিতায় এই জল্লাদখানা বধ্যভূমি থেকে ৭০টি মাথার খুলি ও ৫৩৭২টি অন্যান্য অস্থি উদ্ধার করা হয়। নূরী মসজিদ বধ্যভূমি থেকে উদ্ধারকৃত খুলি ও হাড়গোড়ের সঙ্গে পাওয়া গিয়েছিল ছিন্ন জামা-কাপড়, জুতো, স্যান্ডেল, মানিব্যাগসহ ব্যক্তিগত ব্যবহারের অনেক জিনিস। আর নমুনা হিসেবে জল্লাদখানা বধ্যভূমির মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সর্বসাধারণের প্রদর্শনের জন্য রাখা হয় সেই অভিশপ্ত কূপটির পাশে।

জল্লাদখানার ভেতরের চিত্র

১৯৭২ সালের এই দিনে মিরপুরকে মুক্ত করতে লে. সেলিমসহ ৪১ জন সামরিক বাহিনীর সদস্য, শতাধিক পুলিশ এবং মুক্তিযোদ্ধারা এই এলাকায় সম্মুখ সমরে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে মুক্ত হয় মিরপুর। সেইদিন যুদ্ধে অংশ নেওয়া মানুষদের মধ্যে তিন-চারজন ফিরে আসতে পেরেছিলেন। ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালের সারাটা দিন এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত হওয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩১ জানুয়ারি সকালে মুক্ত হয় অবরুদ্ধ মিরপুর।
গণকবরের পাশে নূরী মসজিদ তৈরি হওয়ায় মসজিদের ভেতরেই একটা স্তম্ভ কালো করা হয়েছে শহীদদের স্মরণেনূরী মসজিদের বধ্যভূমি খনন কাজের সঙ্গে জড়িত মুক্তিযোদ্ধা আক্কু চৌধুরী বলেন, আমরা খবর পাই সেই জায়গায় মসজিদ করার সময় হাড়গোড়ের সন্ধান মিলেছে। আমরা সেখানে ছুটে যাই ব্যক্তিগত উদ্যোগে, পরে সেখানে সেনাবাহিনী যুক্ত হয়ে আমরা খনন কাজ চালিয়ে বেশকিছু নমুনা সংগ্রহ করি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় বিহারিরা বাঙালিদের নির্যাতনের পর এখানেই গণকবর দেয়া হয়।

জল্লাদখানা ভেতরের চিত্র

ইতিহাস বলছে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় স্বাধীনতাপ্রিয় বাঙ্গালিদের, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর  রাজাকার, আলবদর, আল-শামস, তাদের ট্রেনিংপ্রাপ্ত জল্লাদ দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে জবাই করে বড় বড় সেফটি ট্যাংকির ভেতরে ফেলে রাখত।

২০০৮ সালে তৎকালীন সরকার পুনরায় জল্লাদখানা কর্মসূচি শুরু করে এবং স্থপতি ও কবি রবিউল হুসাইনের সার্বিক পরিকল্পনায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এর প্রচেষ্টায় তৈরি করা হয় জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠ। এর পূর্বপাশে রয়েছে টেরাকোটা ইট ও লোহার সমন্বয়ে তৈরি শিল্পী রফিকুন নবী ও মুনিরুজ্জামান এর যৌথভাবে করা একটি ভাস্কর্য ‘জীবন অবিনশ্বর’।

কেন মানুষ এখনও চেনেন না সংরক্ষণ করা এই বধ্যভূমি জানতে চাইলে এলাকার একজন বলেন, আমাদের এখানে কেউ আসে না বললেই চলে। আর প্রধান সড়কে যদি কিছু বানানো যায় তাহলে এটার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষিত হবে। আর এখানে একটি স্মৃতি সংরক্ষিত আছে সেটাও তো জানানো হয় না সেভাবে।

জল্লাদখানার মতো বধ্যভূমিগুলোর সঙ্গে এ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে করণীয় প্রশ্নে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, মিরপুরে জল্লাদখানার কথা সেভাবে জানে না কেউ এমনটা না, শনিবার করে সেখানে বিভিন্নসময় স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের আনা হয়, ভিকটিম পরিবারগুলো তাদের সঙ্গে কথা বলে। এক ধরনের আলাপ-আলোচনা হয়। তবে তা যথেষ্ট এটা বলা যাবে না। তিনি মনে করেন, স্কুলের পাঠ্যসূচিতে জাদুঘর পরিদর্শনের বিষয়টি বাধ্যতামূলক হওয়া দরকার।

/এএইচ/