সূত্র জানায়, কিছু-সংখ্যক কারা কর্মকর্তা, কর্মচারী ও রক্ষী মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও প্রভাবশালী বন্দিদের কথা বলিয়ে দেন নিকটজনদের সঙ্গে। এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এতে রাষ্ট্র ও বন্দি—দু’পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব বিষয় বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কারা অধিদফতর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন সময় বৈঠকে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়।
দীর্ঘ পর্যালোচনার পর কারা অধিদফতর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৈধভাবে স্বজনদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। এরইমধ্যে এ পদ্ধতি চালু করতে কারা-কর্তৃপক্ষ কাজ শুরু করেছে। পদ্ধতিটি চালু হলে বন্দিদের সব কলই রেকর্ড করার সিদ্ধান্ত হয়। কয়েকদিন পরপর এসব কল রেকর্ড যাচাই-বাছাই করবেন তারা। বন্দিরা মোবাইল ফোনে কী কথা বলেছেন, সেগুলো শুনবেন কারা কর্তৃপক্ষ। এসব জটিলতা কিভাবে সহজ করা যায়, সেগুলো নিয়ে মোবাইল কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও কথা শুরু করেছে কারাকর্তৃপক্ষ।
কারা সূত্র জানায়, বৈধ পথে কথা বলতে পারলে অবৈধ প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ না হলেও নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এজন্য কারা কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন থেকে এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে আসছিল।
কারাবন্দিদের কাছে মোবাইল ফোন সেট পাওয়ার বিষয়টি স্বীকারও করেন কারা অধিদফতরের আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন। সম্প্রতি তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বলেন, ‘নানা কৌশলে বন্দিরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। তবে, সেটা কারাগারের ভেতর থেকে নয়, বাইরে যাওয়ার পর। আদালতে আনা-নেওয়ার সময় ও এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে নেওয়ার সময় বন্দিরা এ অবৈধ সুবিধা নিয়ে থাকেন।’
কারাগারে থেকে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার এ পদ্ধতির বিষয়টি তদারকি করছেন কারা অধিদফতরের অতিরিক্ত আইজি প্রিজন্স কর্ণেল ফজলুল কবির। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে বিষয়টি নিয়ে তারা ভাবছিলেন। কিভাবে কারাবন্দিরা মোবাইল ফোনে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। সম্প্রতি মন্ত্রণালয় থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পর তারা এ নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। এ পদ্ধতিটি কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায় সেই বিষয়ে এ টু আই নামের একটি সফটওয়্যার কোম্পানি ও টেলিটক পর্যালোচনা করছে।’
ফজলুল কবির বলেন, ‘প্রথমদিন কারাগারে ঢোকার সময়েই স্বজনদের দু’টি মোবাইল ফোন নম্বর কারা কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে বন্দিদের। পরে ওই দু’টি মোবাইল ফোন নম্বরে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন তারা। স্বজনরা সরাসরি ফোন দিতে না পারলেও তারা এসএমএস দিয়ে যেকোনও তথ্য দিতে পারবেন। সেই তথ্য সংশ্লিষ্ট বন্দিকে জানিয়ে দেবেন তারা।’
অতিরিক্ত আইজি প্রিজন্স কর্নেল ফজলুল কবির বলেন, ‘মোবাইল ফোনে কথা বলতে গিয়ে কোনও বন্দি নিয়ম ভঙ্গ করলে, তাকে আর পরবর্তী সময়ে মোবাইল ফোনে কথা বলতে দেওয়া হবে না। প্রতিটি কল রেকর্ডই বিশ্লেষণ করবেন তারা।’
ফজলুল কবির আরও জানান, মোবাইল ফোনে কথা বলার বিষয়টি ছাড়াও কারাগারগুলোকে আধুনিকায়ন ও বন্দিদের ডাটাবেজ তৈরিরও উদ্যোগ নিয়েছেন তারা। ওই ডাটাবেজে বন্দিদের জীবনবৃত্তান্ত, মামলার নম্বর, আগে জেল খেটেছিলেন কিনা, রক্তের গ্রুপ ও আঙুলের ছাপ সংরক্ষণ করা হবে।
কারাগার থেকে বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের মোবাইল ফোনে কথা বলানোর বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এমন একটি সিদ্ধান্ত তাদের রয়েছে। তবে এ পদ্ধতি চালু করার আগে বেশ কিছু প্রক্রিয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে’। তিনি বলেন, ‘বন্দিরা যখন স্বজনদের সঙ্গে কথা বলবেন, তখন সেখানে কারা কর্মকর্তারা দাঁড়িয়ে সে কথা শুনবেন কি না, কারও একান্ত পারিবারিক বিষয় শোনার প্রয়োজন আছে কি না, না শুনলে কী সমস্যা, সেসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই কাজ করতে হবে।’
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন পদ্ধতি চালু আছে জানিয়ে সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান বলেন, ‘নানা কারণেই মানুষ কারাগারে যান। সবাই তো আর ক্রিমিনাল নন। স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে পারলে মনটাও তাদের হাল্কা থাকবে। এছাড়া, কারাগারকে আমরা সংশোধনাগার বলছি। সেখানে যদি কঠোরতা দেখানো হয়, তাহলে তো আর সংশোধনাগার হলো না’। তিনি বলেন, ‘উন্নত বিশ্বের আদলে কারাগারে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ সরকারের রয়েছে। এরমধ্যে মোবাইল ফোনের কথা বলানোর বিষয়টিও রয়েছে। সরকারের নিয়ন্ত্রণে বন্দিদের মোবাইল ফোনে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ থাকলে কারাগারের কিছু অনিয়ম ও দুর্র্নীতিও কমে আসবে।’
/এমএনএইচ/আপ-এসএম