গত ৩১ অক্টোবর দুর্বৃত্তদের নির্মম আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন জাগৃতি প্রকাশনীর সত্ত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপন। একইদিনে দুর্বৃত্তদের আঘাতে গুরুতর আহত হন শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কর্ণধার আহমেদুর রশীদ টুটুল। দীপন চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আর টুটুল প্রাণনাশের ভয়ে রয়েছেন লোকচক্ষুর আড়ালে। দুর্বৃত্তদের দাবি, অভিজিতের বই প্রকাশের কারণেই হত্যা করা হয়েছে দীপনকে। আর হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন টুটুল। প্রকাশকদের ওপর এমন হামলা প্রকাশনা জগতের ওপরও ফেলেছে কালো ছায়া। বইমেলা ও এর সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে সবাই কমবেশি সংকটে আছেন।
তবে সব সংকট ও বাঁধা পেরিয়ে, শোককে শক্তি করে হাল ধরেছেন ফয়সল আরেফিন দীপনের সহধর্মীনি রাজিয়া রহমান জলি, আহমেদুর রশীদ টুটুলের সহধর্মীনি শামিমা রুনা এবং তার বন্ধুরা। জাগৃতি ও শুদ্ধস্বরের মতো স্বনামধন্য প্রকাশনাগুলো এবারের বইমেলায় অংশ নিচ্ছে সব ধরণের বিপত্তি এড়িয়ে। মেলা উপলক্ষে দুটি প্রকাশনাই সর্বোচ্চ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
জাগৃতি থেকে এবার মেলায় আসছে ১৬টি নতুন বই। শুদ্ধস্বরও প্রকাশ করতে যাচ্ছে বেশ কয়েকটি নতুন বই। গত ২৪ জানুয়ারি শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল ফেসবুক স্ট্যাটাসে স্টল নম্বর নিশ্চিত করেন। তিনি তার স্ট্যাটাসে বলেছেন, ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৬তে শুদ্ধস্বরের স্টল নম্বর ৩৭০, ৩৭১, ৩৭২’। তিনি আরও লিখেছেন, ‘রণদা (রণদীপম বসু) তারেক (তারেক রহীম) এবং বন্ধুরা- এ লড়াই চলবে’।
বইমেলার সার্বিক প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের মুখোমুখি হয়েছিলেন দীপনের স্ত্রী ডাক্তার রাজিয়া রহমান জলি। ব্যক্তিজীবনে চিকিৎসক এই নারী বইমেলা আসলে জাগৃতির স্টল সামলানোর দায়িত্ব নিতেন। পেশাগত দায়িত্বের বাইরে মেলার পুরো সময়েই তাকে দেখা যেতো জাগৃতির স্টলে হাসিমুখে বই বিকিকিনি করছেন। মেলা চলাকালে বই প্রকাশ ও তা স্টল পর্যন্ত পৌঁছানোর কাজটি করতেন ফয়সল আরেফিন দীপন, আর স্টলে পরিবেশনের দায়িত্ব নিতেন জলি। দু’জনে মিলেমিশেই মাসব্যাপী বইমেলা সামাল দিতেন তারা। এবার জলিকে একাই সবকিছু করতে হচ্ছে। একা একা বইমেলার পুরো আয়োজন করতে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে জলি জানান, তিনি কোনও প্রতিবন্ধকতাকেই পাত্তা দিচ্ছেন না। দীপনের আরাধ্য কাজগুলো তার মতো পারদর্শীতার সঙ্গে করতে পারেননি, কিন্তু আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
তিনি জানান, জাগৃতির মান বজায় রেখে বরাবরের মতো বইমেলায় অংশ নিতে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, ‘বেঁচে থাকুক দীপনের স্বপ্নযাত্রা। নিজের প্রতিটি হৃদস্পন্দনে আমি দীপনকে ধারণ করি, তাই জাগৃতির কাজ করতে গিয়ে একদম একাকিত্ব বোধ করিনি। সবসময় মনে হয় ছায়ার মতো আমার পাশেই আছে দীপন।’ বইমেলা সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জলি। বইমেলায় নিজের বা জাগৃতি সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে জলি বলেন, আমার একার জন্য কেন আলাদা করে নিরাপত্তা সুবিধা চাইব। তিনি বিশ্বাস করেন,কর্তৃপক্ষ সবার জন্য যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এছাড়া অন্যান্যবারের চেয়ে এবার বইমেলার পরিবেশ অনেক বেশি নিরাপদ থাকবে বলেও শুনেছেন তিনি। আর কোনো অঘটন যেনো কাউকে গ্রাস না করে এমনটাই তার প্রত্যাশা।
জলি আরও বলেন, গত দু’বছরের তুলনায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেক বেশি স্থিতিশীল। মেলার পরিধিও বেড়েছে। তাই আর সবার মতো তিনিও বিশ্বাস করেন, বইমেলা- হারানো প্রাণোচ্ছ্বলতা ফিরে পাবে। তবে দীপনকে হারানোর বেদনা তাদের তাড়িয়ে বেড়াবে আজীবন।
বইমেলার সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে জলি বলেন, তিনি যখন জাগৃতির হাল ধরেছেন তখন বইমেলা দুয়ারে কড়া নাড়ছে। বেশিরভাগ লেখকই পাণ্ডুলিপি প্রকাশকদের দিয়ে দিয়েছেন। আর তার নিজেরও বেশিরভাগ লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। তারপরও নিজে থেকেই অনেক লেখক এসেছেন পাণ্ডুলিপি নিয়ে। পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রকাশক বন্ধুরাও। বিশেষ করে জাগৃতির নিয়মিত লেখক ও প্রিয়মুখ প্রকাশনীর কর্ণধার আহমেদ ফারুক শুভ এবার মেলায় জাগৃতির সবকটি বই প্রকাশে সহায়তা করেছেন। এত ভয়-ভীতি ও অন্ধকারেও যারা পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জলি।
এদিকে দীপন হত্যা মামলা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনও অগ্রগতির খবর পাননি বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।
তবে পরিস্থিতি যাই হোক না কেনো জাগৃতি নিয়ে জলি যেতে চান বহুদূর, যা দীপনের স্বপ্ন ছিল।
/পিএইচ/